নারীর জন্য স্থান, নাকি নারীকে রাখার স্থান? মোরাল পলিটিক্সের পাঠ
মোরাল পলিটিক্স, সাবঅল্টার্নের আত্মসাৎ এবং জনপরিসর পুনর্গঠনের বৈশ্বিক কৌশল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার এক কোণে একটি টেবিল পর্দা দিয়ে ঘিরে “Female Zone” তৈরি করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুসারে, নারী শিক্ষার্থীরা সেখানে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো, পোশাক ঠিক করা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। উদ্যোগটি ডাকসুর কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদকের উদ্যোগে এবং ডাকসুর সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে উদ্বোধন করা হয়।
এটুকু ঘটনার দৃশ্যমান অংশ। কিন্তু পর্দাটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক প্রশ্নও হাজির করে:
এটি কি নারীর জন্য নতুন অধিকার সৃষ্টি করছে, নাকি উন্মুক্ত জনপরিসরের মধ্যে নারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নির্ধারণ করছে?
আরও স্পষ্টভাবে বললে: এটি কি নারীর জন্য স্থান, নাকি নারীকে রাখার স্থান?
ঘটনাটির সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যক্ষ সাংগঠনিক সংযোগ আছে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখন পর্যন্ত আমি পাইনি। অতএব এটিকে “জামায়াতের পরিকল্পনা” হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা দায়িত্বশীল হবে না। কিন্তু নারীকে সামনে রেখে সামাজিক বৈধতা অর্জন, “নিরাপত্তা” ও “মর্যাদা”র ভাষায় জনপরিসর পুনর্গঠন এবং নারীর দৃশ্যমান অংশগ্রহণকে পুরুষতান্ত্রিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার কৌশল দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নথিবদ্ধ হয়েছে।
সেই তুলনামূলক ইতিহাস থেকেই টিএসসির পর্দাটিকে সন্দেহের সঙ্গে পড়া প্রয়োজন।
১. RSS: নারীকে শক্তি বলা, কিন্তু নেতৃত্ব পুরুষের হাতে রাখা
ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS ঐতিহাসিকভাবে পুরুষদের সংগঠন। নারীদের RSS-এর একই শাখায় অন্তর্ভুক্ত না করে ১৯৩৬ সালে পৃথক রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠন দুটি আদর্শিকভাবে ঘনিষ্ঠ হলেও কাঠামোগতভাবে পৃথক। RSS-এর নেতৃত্ব পুরুষদের হাতে থাকে; নারীদের সাংগঠনিক শক্তি একটি সমান্তরাল নারীসংগঠনের মধ্যে পরিচালিত হয়।
এই বিভাজন নিছক প্রশাসনিক নয়। রাষ্ট্রীয় সেবিকা সমিতির রাজনৈতিক ভাষায় নারীকে প্রায়ই মাতা, সংস্কৃতির রক্ষক, হিন্দু জাতির নৈতিক ভিত্তি এবং প্রয়োজনে দুর্গা হিসেবে কল্পনা করা হয়। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, সংগঠনটির নারীরা নিছক নিষ্ক্রিয় অনুসারী নন; তাঁরা হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের সক্রিয় নির্মাতা। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রধানত মাতৃত্ব, পরিবার, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও জাতির সুরক্ষার ভাষার মধ্যেই বৈধতা লাভ করে।
এই মডেলের মৌলিক বৈপরীত্য হলো:
নারীকে শক্তিশালী হতে বলা হয়, কিন্তু কোন উদ্দেশ্যে শক্তিশালী হবে তা আগেই নির্ধারিত থাকে।
তিনি নিজের শরীর, যৌনতা, ধর্ম, বিবাহ কিংবা রাজনৈতিক মতামতের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে শক্তিশালী নন। তিনি শক্তিশালী হবেন পরিবার, ধর্ম ও জাতির পূর্বনির্ধারিত নৈতিক সীমানা রক্ষার জন্য।
তাঁকে ঘর থেকে বের করা হয়, কিন্তু ঘরের মূল্যবোধ বহন করে জনপরিসরকে নতুন করে ঘর বানানোর দায়িত্বও তাঁর ওপর দেওয়া হয়।
নারীর মাধ্যমে সামাজিক বিস্তার
RSS-ঘনিষ্ঠ বৃহত্তর সংঘ পরিবার শুধু নির্বাচনী রাজনীতিতে কাজ করে না। শিক্ষা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সেবা, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্ররাজনীতি, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও পাড়া-ভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উপস্থিতি নির্মাণ করে। এই কাঠামোয় নারীদের অংশগ্রহণ সংগঠনকে পরিবার ও দৈনন্দিন জীবনের গভীরে পৌঁছাতে সাহায্য করে। RSS-এর বিস্তৃত সহযোগী নেটওয়ার্ক শিক্ষা, শ্রম, যুব, ধর্ম ও রাজনীতিসহ বহু ক্ষেত্রে সক্রিয়।
এর ফলে নারী শুধু একজন কর্মী নন; তিনি হয়ে ওঠেন পরিবারের ভেতর মতাদর্শের বাহক, শিশুদের নৈতিক শিক্ষক, প্রতিবেশের সামাজিক সংগঠক এবং রাজনৈতিক প্রকল্পের মানবিক মুখ।
২. পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী: নারীর সক্রিয়তা, পৃথক সংগঠন ও পুরুষ নেতৃত্ব
আবুল আলা মওদুদীর প্রাথমিক রাজনৈতিক চিন্তায় নারীর প্রধান ও “স্বাভাবিক” স্থান ছিল পরিবার। নারী জনপরিসরে অংশ নিতে পারেন, কিন্তু তাঁর সামাজিক ভূমিকা মাতৃত্ব, পরিবার রক্ষা এবং পৃথক লিঙ্গীয় দায়িত্বের কাঠামোর মধ্যেই ব্যাখ্যা করা হতো। সময়ের সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে জামায়াতের নারীসম্পর্কিত ভাষা পরিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষা, ভোট, কর্মসংস্থান এবং সংগঠিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য বেশি জায়গা তৈরি হয়েছে; কিন্তু এই পরিবর্তন সর্বক্ষেত্রে সমঅধিকারভিত্তিক নেতৃত্বে রূপ নেয়নি।
পাকিস্তানে জামায়াতের নারী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, পরিবার, দাওয়াহ, সামাজিক সেবা ও নির্বাচনী প্রচারে ভূমিকা রেখেছে। এই সংগঠন নারীদের প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্ক এবং জনপরিসরে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কাজেই নারীদের কেবল “ব্যবহৃত পুতুল” বলা তাঁদের বাস্তব এজেন্সি অস্বীকার করবে।
কিন্তু অন্যদিকে, সেই এজেন্সি এমন একটি আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে কাজ করে যেখানে পুরুষকে পরিবার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান হিসেবে ধরা হতে পারে। নারী প্রচার করবেন, ভোটার সংগঠিত করবেন, পরিবারে মতাদর্শ ছড়িয়ে দেবেন এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করবেন—কিন্তু চূড়ান্ত নেতৃত্ব পুরুষের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
এখানে নারীর অংশগ্রহণ ও নারীর সমতা একই বিষয় নয়।
৩. বাংলাদেশ জামায়াত: মাতৃত্ব থেকে “নিরাপত্তা”—ভাষার অভিযোজন
এলোরা শেহাবুদ্দিনের গবেষণা দেখায়, বাংলাদেশ জামায়াতের নারীসম্পর্কিত বক্তব্য সময়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। মওদুদীর ঘরকেন্দ্রিক অবস্থানের তুলনায় পরবর্তী জামায়াত নেতারা নারীর শিক্ষা, কাজ, ভোট ও ব্যক্তিগত ধর্মীয় দায়িত্ব স্বীকার করার ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা নারীর মাতৃত্বকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ইসলামের নারী-বান্ধবতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। শেহাবুদ্দিনের বিশ্লেষণ অনুসারে, এই পরিবর্তনের পেছনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং দরিদ্র নারী ভোটারদের সমর্থন লাভের প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এটি আদর্শিক পরিবর্তন হতে পারে; আবার রাজনৈতিক অভিযোজনও হতে পারে। দুটি সম্ভাবনা পরস্পরবিরোধী নয়।
২০২৫ সালে জামায়াতের নারী বিভাগের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি চিফের সঙ্গে বৈঠক করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে দলটির নারী শাখা বড় সমাবেশও আয়োজন করে। অর্থাৎ নারী শাখা দলটির জনসমক্ষে উপস্থিতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং ভোটার সংগঠনের দৃশ্যমান অংশ।
এখানেই রাজনৈতিক কৌশলটির কেন্দ্রীয় দ্বৈততা ধরা পড়ে:
নারীর সক্রিয়তা প্রয়োজন, কিন্তু নারীর সার্বভৌম নেতৃত্ব প্রয়োজনীয় নয়।
নারীর দৃশ্যমানতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই দৃশ্যমানতার শর্ত নির্ধারণ করবে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ।
“নারীর অধিকার”কে “নারীর নিরাপত্তা” দিয়ে প্রতিস্থাপন করাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। অধিকার নারীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রে নারীকে সুরক্ষার প্রয়োজনসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে নির্মাণ করে—এবং সুরক্ষাদাতা হিসেবে পুরুষ, পরিবার, দল বা নৈতিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ায়।
নিরাপত্তা বাস্তব প্রয়োজন। কিন্তু নিরাপত্তার ভাষা প্রশ্নহীন নয়:
- নিরাপদ রাখার নামে নারীর চলাচল কে নির্ধারণ করবে?
- কোন পোশাককে নিরাপদ বলা হবে?
- কার সঙ্গে বসা নিরাপদ?
- কখন বাইরে থাকা নিরাপদ?
- “নিরাপদ নারী”র বিপরীতে কোন নারীকে বিপজ্জনক বা অশুচি বানানো হবে?
৪. মুসলিম ব্রাদারহুড: কল্যাণসেবা থেকে নৈতিক সমাজ
মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দাতব্য কার্যক্রম এবং স্থানীয় কল্যাণ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। গবেষণায় এসব প্রতিষ্ঠানকে কখনো রাষ্ট্রের বিকল্প সেবাব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতিযোগী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এই নেটওয়ার্কে নারীরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কারণ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু, পরিবার ও দরিদ্র সহায়তার কাজ সহজেই “নারীর স্বাভাবিক সেবামূলক ভূমিকা” হিসেবে গ্রহণযোগ্য করা যায়। এর মাধ্যমে নারী ঘরের বাইরে আসেন, সংগঠক হন, দক্ষতা অর্জন করেন এবং মানুষের আস্থা পান।
কিন্তু সামাজিক সেবা নিরপেক্ষ নয়। সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে একটি আদর্শ নৈতিক সমাজের ধারণাও প্রচার করতে পারে। কে “যোগ্য” দরিদ্র, কেমন পরিবার “সুস্থ”, কোন নারী “সম্মানিত”, কোন আচরণ “ইসলামী”—এসব সংজ্ঞাও সেবার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে কল্যাণসেবা শুধু মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে না; এটি রাজনৈতিক নৈতিকতার দৈনন্দিন অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে।
এখানে বলপ্রয়োগের বদলে বিশ্বাস, কৃতজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং নৈতিক ঋণ কাজ করে।
৫. ইরান: বিপ্লবের দৃশ্যমান নারী থেকে রাষ্ট্রের নৈতিক নারী
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিপ্লবের পরে নারীরা জনপরিসর থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হননি; শিক্ষা, পেশা, রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে তাঁদের উপস্থিতি অব্যাহত থেকেছে। কিন্তু রাষ্ট্র নারীর পোশাক, শরীর ও জনপরিসরে আচরণকে বিপ্লবী ইসলামি শৃঙ্খলার দৃশ্যমান সূচকে পরিণত করে।
এখানে নারী শুধু রাষ্ট্রের নাগরিক নন। তাঁর শরীর রাষ্ট্রের নৈতিকতার বিজ্ঞাপন।
রাষ্ট্র কতটা ইসলামি, তা পুরুষের পোশাক দেখে নয়—প্রধানত নারীর চুল, পোশাক ও চলাচল দেখে মাপা হয়। ফলে রাষ্ট্র ও বিরোধী আন্দোলন উভয়ের কেন্দ্রেই নারীর শরীর একটি রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠে।
এটি মোরাল পলিটিকসের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য:
সমাজের নৈতিক অবস্থা যাচাই করতে ক্ষমতা নারীর শরীরকে দৃশ্যমান পরীক্ষাগারে পরিণত করে।
৬. সাবঅল্টার্নের বাজে ব্যবহার: “নারীর পছন্দ” বললেই কি রাজনীতি শেষ?
টিএসসির পর্দার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হতে পারে: কিছু নারী নিজেরাই এই স্থান চেয়েছেন; কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে না; অতএব এর বিরোধিতা নারীর পছন্দকে অবজ্ঞা করা।
এই যুক্তিকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। নারীর ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা মাতৃদুগ্ধ প্রদানের প্রয়োজনকে “পশ্চাৎপদতা” বলে বাতিল করা নিঃসন্দেহে শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক ঔদ্ধত্য হতে পারে।
কিন্তু এখানেই “সাবঅল্টার্ন” ধারণার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
সব নারী একই অবস্থানে নেই। নারীর পছন্দও সামাজিক ক্ষমতার বাইরে জন্মায় না। একটি পছন্দ একই সঙ্গে সত্যিকার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘ সামাজিক প্রশিক্ষণের ফল হতে পারে। তাই নারী কোনো ব্যবস্থা চেয়েছেন—এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটি ব্যবস্থাটির রাজনৈতিক ফলাফল পরীক্ষা না করার কারণ নয়।
“প্রান্তিক নারীর কণ্ঠ” কথাটি ব্যবহার করে নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলো বন্ধ করা যায় না:
- কারা নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন?
- কতজন নারীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে?
- বিরোধী মতের নারী কি কথা বলতে নিরাপদ বোধ করেন?
- ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অবিশ্বাসী, কুইয়ার কিংবা পর্দাহীন নারী কি “নারী” শ্রেণিটির মধ্যে আছেন?
- একজন নারী পর্দার বাইরে বসলে তাঁর শালীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কি?
- আজকের ঐচ্ছিক ব্যবস্থা কাল সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হতে পারে কি?
সাবঅল্টার্নের নামে কথা বলার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ হলো নির্বাচিত সাবঅল্টার্নবাদ: যে প্রান্তিক কণ্ঠ রাজনৈতিক প্রকল্পকে সমর্থন করে তাকে “প্রকৃত জনতা” বলা, আর যে নারী অসম্মতি জানান তাকে “এলিট”, “পশ্চিমা”, “ধর্মবিদ্বেষী” বা “অশালীন” বলে বাদ দেওয়া।
এতে সাবঅল্টার্ন কথা বলেন না; ক্ষমতা নিজের পছন্দের সাবঅল্টার্নকে মাইক্রোফোন দেয়।
৭. “Female Zone” কোন নারীর জন্য?
“নারীর জন্য” কোনো স্থান তৈরি হলেই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—সেখানে “নারী” বলতে কাকে কল্পনা করা হয়েছে?
সম্ভবত যে নারী:
- নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক পরেন;
- পুরুষের দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে চান;
- মাতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় মনে করেন;
- নারী-পুরুষের আলাদা অবস্থানকে স্বাভাবিক মনে করেন;
- ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রয়োজন অনুভব করেন।
তাঁর প্রয়োজন বাস্তব এবং সম্মানযোগ্য।
কিন্তু পাশাপাশি আরও নারী আছেন:
- যিনি পুরুষ সহপাঠীর সঙ্গে বসতে চান;
- যিনি মাথা ঢাকেন না;
- যিনি ধর্মীয় ভাষায় নিজের অধিকার ব্যাখ্যা করেন না;
- যিনি মা নন;
- যিনি লিঙ্গবৈচিত্র্যের মানুষ;
- যিনি পর্দাকে নিজের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের স্মৃতি হিসেবে দেখেন;
- যিনি প্রকাশ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোকে অশালীন মনে করেন না।
পর্দার রাজনীতি নির্ধারিত হবে দ্বিতীয় ধরনের নারীর সঙ্গে কী আচরণ করা হয় তার মাধ্যমে।
পর্দার ভেতরের নারীকে “শালীন”, “নিরাপদ” ও “সম্মানিত” হিসেবে নির্মাণ করলে পর্দার বাইরের নারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপরীত অর্থ বহন করতে শুরু করেন। তাঁকে সরাসরি কিছু না বলেও “কম শালীন”, “পশ্চিমা”, “বেপরোয়া” কিংবা “পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণকারী” হিসেবে পাঠ করা হতে পারে।
প্রত্যেক পবিত্র স্থানই একটি সম্ভাব্য অশুচি বহির্ভাগ তৈরি করে।
অতএব প্রশ্ন শুধু কে প্রবেশ করতে পারবে তা নয়। প্রশ্ন হলো:
এই স্থানটির অস্তিত্ব কাদের আচরণকে সন্দেহজনক করে তুলবে?
৮. মোরাল রাজনৈতিক প্রকল্প কীভাবে এগোয়
তুলনামূলক উদাহরণগুলো থেকে একটি সাধারণ কৌশলগত ধারা শনাক্ত করা যায়। এটি কোনো গোপন বৈঠকের অভিন্ন পরিকল্পনা নয়; বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা দেওয়া একটি রাজনৈতিক ব্যাকরণ।
প্রথম ধাপ: বাস্তব কষ্ট শনাক্ত করা
নারীরা হয়রানির শিকার হন। শৌচাগার অপর্যাপ্ত। মাতৃদুগ্ধ প্রদানের স্থান নেই। পরিবার ও কাজ সামলাতে অসুবিধা হয়। রাষ্ট্র বা বিশ্ববিদ্যালয় যথেষ্ট সেবা দেয় না।
দ্বিতীয় ধাপ: সেবা ও নিরাপত্তা দেওয়া
আলাদা স্থান, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, ধর্মীয় শিক্ষা, পরিবার সহায়তা কিংবা নারী নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়।
তৃতীয় ধাপ: সেবাকে নৈতিক অর্থ দেওয়া
বলা হয়, “আমরাই নারীর প্রকৃত মর্যাদা বুঝি”; “পশ্চিমা নারীবাদ অধিকার চায়, আমরা নিরাপত্তা দিই”; “নারীকে সম্মান করতে হলে তাঁকে বিশেষভাবে রাখতে হবে।”
চতুর্থ ধাপ: আদর্শ নারী নির্মাণ
মা, স্ত্রী, সেবিকা, শালীন ছাত্রী, ধর্মীয় কর্মী এবং সংস্কৃতির রক্ষক—এই পরিচয়গুলোকে রাজনৈতিকভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
পঞ্চম ধাপ: বিপরীত নারী নির্মাণ
“অতিরিক্ত স্বাধীন, পরিবারবিরোধী, ধর্মবিরোধী, যৌনভাবে অনিয়ন্ত্রিত কিংবা বিদেশি সংস্কৃতির অনুসারী” নারীকে সামাজিক বিপদের প্রতীক করা হয়।
ষষ্ঠ ধাপ: নারীকে সামনে, পুরুষকে কেন্দ্রে রাখা
নারীরা সমাবেশ করেন, ভোট চান, সেবা দেন এবং বিরোধীদের সমালোচনার জবাব দেন। কিন্তু মতাদর্শ, প্রার্থী নির্বাচন এবং চূড়ান্ত নেতৃত্বে পুরুষের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।
এই ব্যবস্থায় নারী অদৃশ্য নন। বরং অত্যন্ত দৃশ্যমান।
কিন্তু দৃশ্যমানতা ক্ষমতার সমার্থক নয়।
৯. টিএসসির পর্দাকে কেন সন্দেহ করা বৈধ
টিএসসি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমগ্র সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করে—একটি এমন কেন্দ্র, যা শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড ও অভিন্ন ক্যাম্পাসজীবনকে উৎসাহিত করে। তাই এই স্থানে নতুন লিঙ্গীয় সীমারেখা তৈরি নিছক ক্যাফেটেরিয়া ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়।
পর্দাটি সন্দেহ করা মানে এর ব্যবহারকারী নারীকে অপমান করা নয়। বরং সন্দেহের বিষয় হলো:
- এটি কি ব্যবহারকারীদের পরামর্শে তৈরি হয়েছে?
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন ও প্রয়োজন-সমীক্ষা ছিল কি?
- মাতৃদুগ্ধ প্রদানের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ, পরিচ্ছন্ন কক্ষের বদলে ক্যাফেটেরিয়ার টেবিল কেন?
- “পোশাক ঠিক করা”কে ক্যাফেটেরিয়ায় আলাদা অঞ্চল তৈরির যুক্তি হিসেবে কে সংজ্ঞায়িত করেছে?
- এই সুবিধা কি শুধু নারীদের জন্য, নাকি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশুসহ অভিভাবক ও ব্যক্তিগত যত্নের প্রয়োজন থাকা অন্যদের জন্যও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা আছে?
- পর্দার বাইরে বসা নারীর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কি অক্ষুণ্ন থাকবে?
- এই স্থানের পর নারী-পুরুষের আলাদা সারি, আলাদা টেবিল বা আলাদা কার্যক্রমের দাবি উঠবে কি?
- উদ্যোগটির প্রভাব ছয় মাস পরে স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন করা হবে কি?
এসবের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সন্দেহ শুধু বৈধ নয়; গণতান্ত্রিকভাবে প্রয়োজনীয়।
উপসংহার: দেয়ালটি কাপড়ের, রাজনীতিটি স্থানের
টিএসসির পর্দা আকারে ক্ষুদ্র। কিন্তু জনপরিসরের রাজনীতিতে ক্ষুদ্র স্থাপত্য কখনো ক্ষুদ্র থাকে না। একটি পর্দা বলে দেয় কোন কাজ প্রকাশ্য, কোনটি ব্যক্তিগত; কোন শরীর স্বাভাবিক, কোনটি আড়ালযোগ্য; কে কাকে দেখতে পারে; কার অস্বস্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; এবং নারীর নিরাপত্তার দায়িত্ব সমাজ নেবে, নাকি নারীকে আড়াল করে সমস্যাটির সমাধান দেখানো হবে।
RSS-এর নারীসংগঠন, দক্ষিণ এশিয়ার জামায়াতগুলো, মুসলিম ব্রাদারহুডের কল্যাণ নেটওয়ার্ক এবং ইরানের নৈতিক রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্র এক নয়। তাদের একাকার করা ভুল হবে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে একটি ব্যাকরণ স্পষ্ট:
নারীকে জনপরিসরে আনা যায় জনপরিসর মুক্ত করার জন্য; আবার নারীকে সামনে রেখেই জনপরিসরকে আরও নৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত করা যায়।
তাই “নারীরা নিজেরাই চেয়েছেন” কিংবা “এটি শুধু একটি ঐচ্ছিক সুবিধা”—এই দুটি বাক্যে আলোচনা শেষ করা যাবে না।
দেখতে হবে, নারীর কোন চাওয়া স্বীকৃত হচ্ছে। কোন নারীকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কোন নারীকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। আর সেই আদর্শের বাইরে থাকা নারীকে ধীরে ধীরে কোন সামাজিক ভাষায় অশুচি, অনিরাপদ বা অনধিকারী করে তোলা হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি পর্দা থাকবে কি থাকবে না, শুধু সেটি নয়।
প্রশ্নটি হলো:
পর্দাটি কি নারীর প্রয়োজন অনুযায়ী সরানো যাবে, নাকি একসময় নারীকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই পর্দাটি থেকে যাবে?
নারীর জন্য স্থান সেই স্থান, যার নকশা, ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ নারী নিজে নির্ধারণ করতে পারেন।
নারীকে রাখার স্থান সেই স্থান, যেখানে তাঁকে সম্মানের ভাষায় স্থাপন করা হয়—কিন্তু নিজের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষমতা দেওয়া হয় না।
References
Abdel-Latif, O. (2008). In the Shadow of the Brothers: The Women of the Egyptian Muslim Brotherhood. Carnegie Middle East Center.
Afary, J. (2009). Sexual Politics in Modern Iran. Cambridge University Press.
Ali, S., & Kayyal, M. (2023). The Impact of Mandatory Hijab Laws on Women’s Rights in Iran: A Human Rights Perspective. Global Campus Human Rights Journal, 7(1), 22–39.
Bacchetta, P. (2004). Gender in the Hindu Nation: RSS Women as Ideologues. Women Unlimited.
Basu, A., & Sarkar, T. (Eds.). (2022). Women, Gender and Religious Nationalism. Cambridge University Press.
Biagini, É. (2020). The Egyptian Muslim Sisterhood: Hierarchies, Ambiguities and Negotiations. Amsterdam University Press.
Brooke, S. (2019). Winning Hearts and Votes: Social Services and the Islamist Political Advantage. Cornell University Press.
Clark, J. A. (2004). Islam, Charity, and Activism: Middle-Class Networks and Social Welfare in Egypt, Jordan, and Yemen. Indiana University Press.
Enloe, C. (2014). Bananas, Beaches and Bases: Making Feminist Sense of International Politics (Rev. ed.). University of California Press.
Fraser, N. (1990). Rethinking the Public Sphere: A Contribution to the Critique of Actually Existing Democracy. Social Text, 25/26, 56–80.
Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks. International Publishers.
Guha, R. (Ed.). (1982). Subaltern Studies I. Oxford University Press.
Iqtidar, H. (2011). Secularizing Islamists? Jama’at-e-Islami and Jama’at-ud-Da’wa in Urban Pakistan. University of Chicago Press.
Jamal, A. (2005). Feminist “Selves” and Feminism’s “Others”: Feminist Representations of Jamaat-e-Islami Women in Pakistan. Feminist Review, 81, 52–73.
Jamal, A. (2013). Jamaat-e-Islami Women in Pakistan: Vanguard of a New Modernity? Syracuse University Press.
Kandiyoti, D. (1988). Bargaining with Patriarchy. Gender & Society, 2(3), 274–290.
Kapur, R. (2020). Gender and the “Faith” in Law: Equality, Secularism, and the Rise of the Hindu Nation. Journal of Law and Religion, 35(3), 407–431.
Mahmood, S. (2005). Politics of Piety: The Islamic Revival and the Feminist Subject. Princeton University Press.
Menon, K. D. (2005). We Will Become Jijabai: Historical Tales of Hindu Nationalist Women in India. The Journal of Asian Studies, 64(1), 103–126.
Menon, K. D. (2010). Everyday Nationalism: Women of the Hindu Right in India. University of Pennsylvania Press.
Mohanty, C. T. (1984). Under Western Eyes: Feminist Scholarship and Colonial Discourses. Boundary 2, 12/13, 333–358.
Najmabadi, A. (1991). Hazards of Modernity and Morality: Women, State and Ideology in Contemporary Iran. In D. Kandiyoti (Ed.), Women, Islam and the State. Temple University Press.
Paidar, P. (1995). Women and the Political Process in Twentieth-Century Iran. Cambridge University Press.
Sarkar, T. (1995). Heroic Women, Mother Goddesses: Family and Organization in Hindutva Politics. In T. Sarkar & U. Butalia (Eds.), Women and the Hindu Right. Kali for Women.
Sarkar, T., & Butalia, U. (Eds.). (1995). Women and the Hindu Right. Kali for Women.
Scott, J. W. (1986). Gender: A Useful Category of Historical Analysis. The American Historical Review, 91(5), 1053–1075.
Sedghi, H. (2007). Women and Politics in Iran: Veiling, Unveiling, and Reveiling. Cambridge University Press.
Shehabuddin, E. (2008). Jamaat-i-Islami in Bangladesh: Women, Democracy and the Transformation of Islamist Politics. Modern Asian Studies, 42(2–3), 577–603.
Shehabuddin, E. (2008). Reshaping the Holy: Democracy, Development, and Muslim Women in Bangladesh. Columbia University Press.
Shehabuddin, E. (2010). Jamaat-i-Islami in Bangladesh: Women, Democracy and the Transformation of Islamist Politics. In Islamic Reform in South Asia. Cambridge University Press.
Spivak, G. C. (1988). Can the Subaltern Speak? In C. Nelson & L. Grossberg (Eds.), Marxism and the Interpretation of Culture (pp. 271–313). University of Illinois Press.
Warner, M. (2002). Publics and Counterpublics. Zone Books.
Wickham, C. R. (2002). Mobilizing Islam: Religion, Activism, and Political Change in Egypt. Columbia University Press.
Yuval-Davis, N. (1997). Gender and Nation. SAGE.
Primary Contemporary Sources
- University of Dhaka. Teacher-Student Centre (TSC) official webpage.
- The Daily Star. “DUCSU’s Female Zone at TSC Draws Mixed Reactions.”
- Carnegie Endowment for International Peace. “Hijab in Iran: From Religious to Political Symbol.”
- Brandeis University, Crown Center for Middle East Studies. “The Islamic Republic of Iran’s Chastity and Hijab Law and Its Political Significance.”