| | | | | |

১৮ জুলাই: যেদিন গেটগুলো খোলা ছিল

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জুলাইয়ের প্রাত্যহিক নাগরিক ইতিহাস

জুলাইয়ের পর আমি আমার শিক্ষার্থীদের একটি কাজ দিয়েছিলাম। তাঁদের বলেছিলাম, বড় ইতিহাস লেখার চেষ্টা করবেন না। প্রতিদিন কোথায় ছিলেন, কী দেখেছেন, কী শুনেছেন, কখন ভয় পেয়েছেন, কোন ঘটনায় আপনার অবস্থান বদলে গেছে—শুধু সেগুলো লিখে রাখেন।

তাঁদের লেখাগুলো পড়তে গিয়ে দেখলাম, ইতিহাস সব সময় নেতার বক্তৃতা, ঘোষণাপত্র কিংবা রাজপথের বহুল প্রচারিত ছবির মধ্যে থাকে না। ইতিহাস কখনো থাকে একটি অসমাপ্ত অ্যাসাইনমেন্টে, মায়ের বারবার ফোনে, ফুরিয়ে আসা মোবাইল ব্যালান্সে, একটি খোলা গেটে, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্সে, ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে পাঠানো সতর্কবার্তায় কিংবা এমন একজন শিক্ষার্থীর কান্নায়—যিনি নিজেও জানেন না, ঠিক কেন কাঁদছেন।

দুই বছর আগে আজকের দিনটিও ছিল ১৮ জুলাই।

২০২৪ সালের সেই বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হয়তো জানতেন না, দিন শেষে তাঁরা আর আগের মানুষটি থাকবেন না। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন শিক্ষার্থী হিসেবে; কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বদলে তাঁদের সামনে খুলে গিয়েছিল ধোঁয়ায় ঢাকা রাস্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট হয়ে উঠেছিল আশ্রয়স্থল, মেডিকেল সেন্টার জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া সহায়তার জায়গা, আর অনলাইন গ্রুপগুলো বিপদের সংবাদ আদান-প্রদানের নেটওয়ার্ক।

একজন অংশগ্রহণকারী পরে লিখেছিলেন:

“১৮ জুলাইয়ের আগের আমি আর পরের আমির মধ্যে বিরাট পার্থক্য। মানসিকভাবে, এমনকি শারীরিকভাবেও আমি আর আগের মানুষটি ছিলাম না।”

এই একটি বাক্যের মধ্যেই ১৮ জুলাইয়ের গভীর সামাজিক ইতিহাস ধরা পড়ে। আন্দোলন শুধু ক্ষমতার বিন্যাস বদলায় না; আন্দোলন বদলে দেয় তার ভেতর দিয়ে যাওয়া মানুষটিকেও। যে মানুষটি আগের দিন পর্যন্ত নিজেকে রাজনীতির বাইরের কেউ মনে করেছিলেন, ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করে তিনিই আবিষ্কার করেন—রাজনীতি আসলে তাঁর জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং অন্য মানুষের প্রতি দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।

দুই বছর পরে আমরা যখন জুলাইকে স্মরণ করি, তখন তাই শুধু জিজ্ঞেস করলে চলবে না—সেদিন কী ঘটেছিল? আরও জানতে হবে—কাদের অভিজ্ঞতা জুলাইয়ের স্বীকৃত ইতিহাসে জায়গা পাচ্ছে? আর কাদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে দৃশ্যের আড়ালে চলে যাচ্ছে?

ইতিহাসে প্রবেশের আগে মানুষ দেখতে খুব সাধারণ

শিক্ষার্থীদের স্মৃতিকথায় জুলাইয়ের শুরুর দিনগুলো প্রায় নিরুত্তাপ। কেউ পরীক্ষা দিয়েছেন। কেউ ক্লাস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে খেতে গেছেন। কেউ মোটরসাইকেল চালিয়েছেন, ফুটবল খেলেছেন, পরিবারের জন্য রান্না করেছেন। কেউ অসুস্থ হয়ে সারা দিন ঘুমিয়েছেন। কেউ আন্দোলনের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, কিন্তু পথে নামার প্রয়োজন বোধ করেননি। আবার কেউ সড়ক অবরোধে মানুষের দুর্ভোগ দেখে আন্দোলনকারীদের ওপর বিরক্তও হয়েছিলেন।

এই দৈনন্দিন বিবরণগুলো আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ। অথচ এগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসে প্রবেশের আগে মানুষ দেখতে খুব সাধারণ।

একজন অংশগ্রহণকারী নিজের আগের জীবন স্মরণ করে লিখেছেন:

“আমার জীবন ছিল খুব সাধারণ ও শান্ত—কোডিং, মোটরসাইকেল চালানো, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। জুলাই যে আমার জীবনকে এভাবে বদলে দেবে, তার কোনো ধারণাই ছিল না।”

আরেকজন স্বীকার করেছেন:

“১১ থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে আমি বুঝতেই পারছিলাম না, কোটা সংস্কারের দাবিতে কেউ কেন নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলবে। আমার কাছে তখন পুরো বিষয়টিই অযৌক্তিক মনে হয়েছিল।”

এই স্বীকারোক্তির বিশেষ মূল্য আছে। কারণ এটি কোনো জন্মগত বীরের আত্মজীবনী নয়। এটি সংশয়, ভুল বোঝাবুঝি ও ব্যক্তিগত দূরত্ব অতিক্রম করে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠার বিবরণ।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি শ্রেণিগত ব্যঙ্গ চালু ছিল। তাঁদের রাজনীতিবিমুখ, সুবিধাভোগী, আত্মকেন্দ্রিক কিংবা ‘ফার্মের মুরগি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের পোশাক, উচ্চারণ, টিউশন ফি ও জীবনযাপন দেখে নাগরিক সামর্থ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ধরে নেওয়া হয়েছে, দেশের কোনো সংকটে তাঁরা হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেবেন, কিন্তু রাস্তায় দাঁড়াবেন না।

এই ধারণার মধ্যে আরও একটি ভুল আছে। ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ নিজেই কোনো সমজাতীয় শ্রেণি নয়। এই পরিচয়ের আড়ালে আছে পরিবার, আয়, অঞ্চল, ভাষা ও জীবনসংগ্রামের বিপুল পার্থক্য। কেউ সম্পূর্ণ বৃত্তিতে পড়েন, কেউ পরিবারের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে, কেউ চাকরি বা টিউশন করে শিক্ষার ব্যয় বহন করেন। কিন্তু সামাজিক কল্পনা এই বৈচিত্র্য মুছে তাঁদের একটিমাত্র সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত করেছিল।

১৮ জুলাই সেই সরলীকরণ ভেঙে দিয়েছিল।

তবে দিনটিকে যদি শুধু ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও সাহসী’—এমন আত্মতৃপ্তির গল্পে নামিয়ে আনি, তাহলেও তার তাৎপর্য ছোট হয়ে যাবে। ১৮ জুলাইয়ের গভীর শিক্ষা হলো, কোনো সামাজিক শ্রেণি স্বভাবগতভাবে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক নয়। মানুষকে রাজনৈতিক করে তোলে অন্যায়ের প্রত্যক্ষতা, পারস্পরিক দায়িত্ব এবং এমন একটি মুহূর্ত—যখন নীরব থাকাও আর নিরপেক্ষ থাকা নয়।

যখন অ্যাসাইনমেন্টের আলোচনা থেমে যায়

জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের কথাবার্তা বদলে যেতে থাকে। ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের জায়গা দখল করে আহত সহপাঠী, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হামলা, নিজেদের নিরাপত্তা এবং পরদিন কোথায় দাঁড়াতে হবে—এসব আলোচনা।

একজন অংশগ্রহণকারী লিখেছিলেন:

“অ্যাসাইনমেন্ট আর পরীক্ষার আলোচনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা কথা বলছিলাম—কীভাবে আন্দোলনের পাশে দাঁড়াব এবং কীভাবে আমাদের কণ্ঠ শোনানো যাবে।”

আরেকজনের ভাষায়:

“ভয় ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে দায়িত্ববোধও ছিল। আমরা বুঝতে পারছিলাম, খুব শিগগির আমরা আরও বড় কিছুর অংশ হয়ে যাব।”

১৬ জুলাই রংপুরে নিরস্ত্র এক শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার দৃশ্য এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হামলার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এসব দৃশ্য শুধু তথ্য হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়নি; পৌঁছেছিল নৈতিক অভিঘাত হিসেবে।

একজন লিখেছেন:

“তার আগে আমি নিজেকে সাহসী মনে করতাম না। কিন্তু দৃশ্যটি দেখার পর আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারিনি।”

আরেকজনের ভাষায়:

“আমি আর শুধু একজন শিক্ষার্থী ছিলাম না। নিজেকে ন্যায়বিচারপ্রত্যাশী একজন মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।”

সামাজিক আন্দোলনের একটি মৌলিক মুহূর্ত সম্ভবত এখানেই: যখন অন্যের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়কে আর ‘অন্যের ঘটনা’ বলে দূরে রাখা যায় না।

নৃবিজ্ঞানী বীণা দাস এমন ঘটনাকে শুধু বড় ঘটনা হিসেবে দেখেননি; তিনি বলেছেন ‘ক্রিটিক্যাল ইভেন্ট’—এমন ঘটনা, যার পরে সমাজের পুরোনো পরিচয় ও শ্রেণিবিভাগ আর আগের মতো কাজ করে না। Veena Das, Critical Events

১৮ জুলাইও তেমন একটি দিন। সেদিন ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অরাজনৈতিক’, ‘পাবলিক’ ও ‘প্রাইভেট’, বিশ্ববিদ্যালয় ও মহল্লা, নিজের নিরাপত্তা ও অপরের প্রতি দায়িত্ব—এসব পরিচিত সীমারেখা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল।

আন্দোলনের কোনো একক সদর দপ্তর ছিল না

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশের আবাসিক হল ছিল না; ছিল না দীর্ঘদিনের ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন। তাঁরা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন এবং ক্লাস শেষে আবার ছড়িয়ে পড়তেন।

কিন্তু এই ছড়িয়ে থাকাই আন্দোলনের সময় নতুন ধরনের সংযোগের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে ছোট ছোট দল তৈরি হয়। কোথায় জড়ো হতে হবে, কোন রাস্তা দিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আসবেন, কোথায় পুলিশ অবস্থান করছে—এসব তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ শিক্ষার্থীরা নবীনদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। কেউ আশপাশের ভবনের ছাদ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। কেউ ঘটনাস্থলে যেতে না পেরে ছবি, ভিডিও ও তথ্য যাচাই করে প্রচার করেন।

একজন অংশগ্রহণকারী লিখেছেন:

“পুরো পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল। ভয় এবং উত্তেজনা পাশাপাশি ছিল। ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও কেউ পিছিয়ে যেতে প্রস্তুত ছিল না।”

তাঁদের কোনো একক সদর দপ্তর ছিল না। আন্দোলনটি ছড়িয়ে ছিল মেসেঞ্জার গ্রুপ, বন্ধুর ফোনকল, ছাদের পর্যবেক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট এবং শহরের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি মোড়ে। তাঁদের সংগঠন দুর্বল ছিল না; তার কাঠামোটি ছিল ভিন্ন—বিকেন্দ্রীভূত, ব্যক্তিনির্ভর এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল।

আন্দোলনকে আমরা সাধারণত মিছিল, বক্তৃতা ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে চিনতে অভ্যস্ত। কিন্তু আন্দোলনের নিচে থাকে আরেকটি প্রায় অদৃশ্য অবকাঠামো—খবর পৌঁছে দেওয়া, অপরিচিত মানুষকে সতর্ক করা, পানি সংগ্রহ করা, আহত ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় নেওয়া, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং বিপদের সময় দরজা খোলা রাখার অবকাঠামো।

১৮ জুলাইয়ের ইতিহাস এই অদৃশ্য শ্রম ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়।

নারীদের অংশগ্রহণ সব সময় রাজপথে দৃশ্যমান ছিল না

জুলাইয়ের ইতিহাসে নারীদের উপস্থিতি নিয়ে কথা বলার সময় একটি পুরোনো ভুল এড়িয়ে চলা দরকার। নারী শিক্ষার্থীদের কেবল ‘যাঁদের নিরাপত্তা দিতে হয়েছিল’ হিসেবে দেখলে তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা আড়াল হয়ে যায়।

তাঁরা আন্দোলনকারী, সংগঠক, সংবাদবাহক, প্রত্যক্ষদর্শী, সহায়তাকারী এবং তথ্য যাচাইকারী ছিলেন। একই সঙ্গে তাঁদের অনেককে পরিবারের উদ্বেগ, চলাচলের নিয়ন্ত্রণ এবং নারী হিসেবে বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হয়েছে।

এক নারী শিক্ষার্থী লিখেছিলেন:

“আমি আন্দোলনে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার পরিবার আমাকে ও আমার ভাইবোনদের বাইরে যেতে দেয়নি; এমনকি দরজার চাবিও সরিয়ে রেখেছিল।”

এই বাক্যটি শুধু একটি পরিবারের ভয় নয়। এটি দেখায়, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ নারী ও পুরুষের কাছে সব সময় সমানভাবে উন্মুক্ত থাকে না। কারও জন্য রাজপথে যাওয়া কেবল রাষ্ট্রীয় বাধা অতিক্রমের বিষয় নয়; ঘরের ভেতরের স্নেহ, ভয়, কর্তৃত্ব ও নিরাপত্তার ব্যবস্থার সঙ্গেও বোঝাপড়া করতে হয়।

কিন্তু তিনি থেমে থাকেননি:

“ভয় ছিল—হয়তো। কিন্তু আমি নিষ্ক্রিয় ছিলাম না। যতটা সম্ভব যাচাই করা তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছি। আমার ভূমিকা খুব ছোট ছিল, কিন্তু তখন সেটুকুও প্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল।”

তিনি সংগৃহীত ছবি, ভিডিও ও তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাঠিয়েছেন; দীর্ঘ পোস্টে যাচাই করা সংবাদ ভাগ করেছেন; আন্দোলনকারীদের সহায়তার জন্য অর্থ দিয়েছেন এবং ঘরে বসেই যে ধরনের সহায়তা সম্ভব, তা করেছেন।

তাঁর আরেকটি বাক্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ:

“আমি যা করতে পেরেছি, ঘর থেকেই করেছি।”

এই ‘ঘর’কে রাজনৈতিকতার বিপরীত স্থান মনে করা ঠিক হবে না। জুলাইয়ে ঘরও কখনো সংবাদকক্ষ, যাচাই ডেস্ক, যোগাযোগকেন্দ্র এবং উদ্বিগ্ন অপেক্ষার স্থানে পরিণত হয়েছিল।

আরেক নারী শিক্ষার্থী ১৮ জুলাই সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে বের হয়েছিলেন। গণপরিবহন না পেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে পথের একটি অংশ হেঁটেছেন। মোবাইল ডেটা বন্ধ থাকায় পথে পরিস্থিতির নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া কঠিন ছিল। পরে তিনি মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আহতদের জন্য সহায়তা আনার চেষ্টা করেন।

তাঁর বিবরণে এসেছে:

“অনেক মেডিকেল দল ক্যাম্পাসে ঢুকতে চাইছিল। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করাই তখন বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”

এখানে নারীর রাজনৈতিক উপস্থিতি শুধু মিছিলের সামনের সারিতে দৃশ্যমান হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যোগাযোগ তৈরি করা, তথ্য পাঠানো, চিকিৎসাসহায়তা সমন্বয় করা এবং পরিবারের বাধার মধ্যেও অংশগ্রহণের পথ তৈরি করা—এসবও আন্দোলনের অপরিহার্য কাজ।

কারও উপস্থিতি রাজপথে ছিল, কারও উপস্থিতি ডিজিটাল নেটওয়ার্কে, কারও ছিল চিকিৎসা ও সরবরাহ ব্যবস্থায়। সব ভূমিকা সমান ছিল—এমন দাবি করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কেবল প্রকাশ্য রাজপথের দৃশ্য দিয়ে অংশগ্রহণের মূল্য নির্ধারণ করলে নারীদের এবং ঘরবন্দী বহু মানুষের নাগরিক শ্রম অদৃশ্য হয়ে যায়।

একজন শিক্ষার্থীর নিজের ভূমিকা নিয়ে অপরাধবোধ ছিল:

“লিখতে গিয়ে নিজেকে কাপুরুষ মনে হচ্ছে, কারণ আমি শারীরিকভাবে সেখানে থাকতে পারিনি।”

কিন্তু তাঁর বিবরণই দেখায়, আন্দোলনের অংশ হওয়ার একটিমাত্র বৈধ পদ্ধতি নেই। রাজপথে থাকা গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে সত্য যাচাই, সংবাদ পৌঁছানো, নিরাপদ যোগাযোগ, অর্থ ও চিকিৎসাসহায়তা এবং স্মৃতি সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিকতার মাপকাঠি শুধু কে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন—এটি নয়; কে নিজের অবস্থান থেকে কী দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সেটিও।

সেই বৃহস্পতিবার সকাল

পরিকল্পনা ছিল বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেরুল বাড্ডা, আফতাবনগর, নতুনবাজার, বসুন্ধরা, কুড়িল ও প্রগতি সরণির বিভিন্ন অংশে জড়ো হবেন। প্রকাশিত সংবাদ ও প্রত্যক্ষ বিবরণ অনুযায়ী, ব্র্যাক, ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথ, আইইউবি, ইউআইইউ, এআইইউবি, ড্যাফোডিলসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর একাধিক স্থানে প্রতিবাদে অংশ নেন। বিশেষ করে বাড্ডা–রামপুরা এলাকা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। The Business Standard

একজন অংশগ্রহণকারী সেই সকাল সম্পর্কে লিখেছেন:

“সকাল দশটার মধ্যেই অনেক শিক্ষার্থী প্রধান গেটের সামনে জড়ো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর আগেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ দেখে আমরা বিস্মিত হই। কী ঘটতে যাচ্ছে, কেউ জানতাম না। বাতাসে ভয় স্পষ্ট ছিল। তারপরও আমরা দাঁড়িয়েছিলাম।”

আরেকজনের ভাষ্যে:

“বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে বের হয়েছিলাম সকাল দশটার দিকে। মোবাইল ডেটা বন্ধ ছিল। পথে ফোনে জানতে পারলাম, পুলিশ ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা শুরু করেছে। কোনো যানবাহন না পেয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করি।”

এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং গুলির মুখে জমায়েত ছত্রভঙ্গ হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভিডিও ও আলোকচিত্র বিশ্লেষণেও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে প্রাণঘাতী ও কম-প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। Amnesty International

কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের স্মৃতিতে অস্ত্রের বিবরণের পাশাপাশি আরেকটি দৃশ্য বারবার ফিরে এসেছে: একটি খোলা গেট।

“আমরা দৌড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ফিরে আসি। গেটটি পুরো সময় খোলা ছিল। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের কাছে একটি আশ্রয়দুর্গের মতো হয়ে উঠেছিল।”

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় করে কী—তার ভবন, পাঠ্যক্রম ও সনদ, নাকি বিপদের দিনে নেওয়া নৈতিক সিদ্ধান্ত?

১৮ জুলাই অন্তত কয়েকটি গেটের উত্তর ছিল স্পষ্ট। প্রতিষ্ঠান তখনই বৃহত্তর জনপরিসরের অংশ হয়ে ওঠে, যখন মানুষের বিপদের সামনে তার দরজা বন্ধ থাকে না।

নিরাপত্তাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করেছেন। নিজেরা কাঁদানে গ্যাসে আক্রান্ত হয়েও গেটের কাছে ছিলেন। শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ক্যাফেটেরিয়া খুলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টার দ্রুত জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জায়গা ফুরিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা জানা শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে এগিয়ে আসতে বলা হয়েছে।

একজন অংশগ্রহণকারী লিখেছেন:

“আমি নিজেও আতঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু যখন স্বেচ্ছাসেবক চাওয়া হলো, সামনে এগিয়ে গেলাম। সেই মুহূর্তে নিজের ভয় নিয়ে ভাবার আর সুযোগ ছিল না।”

এখানেই প্রতিবাদের আরেকটি ভাষা তৈরি হয়। প্রতিবাদ মানে শুধু স্লোগান দেওয়া নয়। প্রতিবাদ মানে কখনো পানি এগিয়ে দেওয়া, আহত মানুষের পাশে বসা, গেট খোলা রাখা, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া অথবা আতঙ্কিত কাউকে বলা—আপনি একা নন।

একটি শিঙাড়া, কয়েকটি পানির বোতল এবং ‘আমরা’

১৮ জুলাইয়ের স্মৃতিতে আশপাশের সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বিশেষভাবে ফিরে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিরা পানি, বিস্কুট, রুটি, কলা এবং যা সম্ভব নিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কোনো সম্পর্ক ছিল না। বিপদের মধ্যেই নতুন একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।

একজন অংশগ্রহণকারী লিখেছেন:

“স্থানীয় মানুষ যা পেরেছেন নিয়ে এসেছেন—পানি, বিস্কুট, রুটি, কলা। তখন মনে হয়েছিল, আমরা একা নই।”

আরেকজনের স্মৃতিতে একজন দোকানির কথা আছে, যিনি শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে শিঙাড়া দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন:

“শুধু সামনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীরাই নন, পানি ও প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আসা মানুষগুলোও ছিলেন; এমনকি বিনা মূল্যে শিঙাড়া দেওয়া দোকানদারটিও এই ইতিহাসের অংশ।”

একটি শিঙাড়া হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বড় কোনো ধারণা নয়। কিন্তু সংকটের দিনে অপরিচিত মানুষের হাতে তুলে দেওয়া সেই সামান্য খাবারই নাগরিক সংহতির বাস্তব ভাষা।

‘আমরা’ শব্দটি সেদিন বদলে গিয়েছিল।

‘আমরা’ আর শুধু একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বোঝাচ্ছিল না। তাতে যুক্ত হচ্ছিল অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্কুল-কলেজের তরুণ, পথচারী, দোকানি, রিকশাচালক, শিক্ষক, নিরাপত্তাকর্মী, চিকিৎসাসেবী এবং আশপাশের বাসিন্দারা।

সেদিন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর দেয়ালঘেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় ও মহল্লার সীমা সাময়িকভাবে ভেঙে একটি বৃহত্তর নাগরিক পরিসর তৈরি হয়েছিল।

এই সংহতিকে রোমান্টিক করার প্রয়োজন নেই। সেখানে ভয়, বিভ্রান্তি, ভুল তথ্য এবং পরস্পরবিরোধী আচরণও ছিল। কিন্তু ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে অপরিচিত মানুষের প্রতি দায়িত্ব নেওয়ার অসংখ্য ছোট ঘটনা একটি গণ-আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।

সাহসের বিপরীত শব্দ সব সময় ভয় নয়

পরবর্তী স্মৃতিকথায় কেউ নিজেকে সম্পূর্ণ নির্ভীক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেননি। প্রায় প্রতিটি বিবরণেই ভয় আছে।

পরিবার থেকে একের পর এক ফোন এসেছে। কেউ বাড়ি ফিরতে পারেননি। দূরের পথ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পর বন্ধুরা কোথায় আছেন, তা জানা যায়নি। কেউ অল্প মোবাইল ব্যালান্স দিয়ে ছোট ছোট ফোনকল করে প্রিয়জনের খবর নিয়েছেন, যাতে অবশিষ্ট মিনিটগুলো দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা যায়।

একজন নারী শিক্ষার্থী লিখেছেন:

“আমার ফোনে অল্প কিছু টাকা ছিল। তা দিয়ে কয়েক মিনিট কিনেছিলাম। সেই মিনিটগুলো তখন আমার কাছে সম্পদের মতো মনে হচ্ছিল। বন্ধু ও পরিবারের খবর নিয়ে দ্রুত কল শেষ করতাম, যেন আরও কিছুদিন যোগাযোগ রাখা যায়।”

ডিজিটাল যুগে যোগাযোগ বন্ধ হওয়া শুধু প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতা নয়। সেটি মানুষের কাছ থেকে অন্যের নিরাপত্তা জানার ক্ষমতা, তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ এবং সাক্ষ্য পাঠানোর পথ কেড়ে নেয়। ১৮ জুলাই রাতে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ হয়; পরে দেশ প্রায় সম্পূর্ণ যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অনুসন্ধান এই ইন্টারনেট বন্ধকে দমন-পীড়নের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদন

একজন অংশগ্রহণকারী পরিবারের প্রতিক্রিয়া স্মরণ করে লিখেছেন:

“তাঁরা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু আমাকে থামাননি। তাঁদের কথা ছিল—এখন শুধু নিজের কথা ভেবে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সময় নয়।”

আরেকজন লিখেছেন:

“আমি শেষ কবে কেঁদেছিলাম মনে নেই। সেদিন কেন কেঁদেছিলাম, সেটিও নিশ্চিত করে বলতে পারি না। যা দেখেছিলাম তার জন্য, নাকি এই মানুষগুলোর পাশে থাকতে পেরে—সম্ভবত সব অনুভূতি একসঙ্গে এসে পড়েছিল।”

এই কান্নাকে দুর্বলতা হিসেবে পড়লে ১৮ জুলাই বোঝা যাবে না। এটি ভয়, অসহায়ত্ব, ক্ষোভ, সংহতি ও আত্ম-আবিষ্কারের সম্মিলিত প্রকাশ।

সাহসের বিপরীত শব্দ সব সময় ভয় নয়। অনেক সময় সাহসের জন্মই হয় ভয় থেকে—যখন মানুষ ভয় থাকা সত্ত্বেও অন্যের প্রতি দায়িত্ব থেকে সরে যায় না।

স্মৃতি ক্যামেরার মতো কাজ করে না

গণ-আন্দোলনের স্মৃতি কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। সময়ের সঙ্গে বহু মানুষ, বহু স্থান ও বহু ধারার একটি আন্দোলনকে কয়েকটি পরিচিত মুখ, কিছু জনপ্রিয় ছবি এবং একটি সরল বিজয়কাহিনির মধ্যে আটকে ফেলা হয়। যে ইতিহাস মঞ্চে সহজে বলা যায়, সেটিই ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ইতিহাস হয়ে ওঠে।

কিন্তু জুলাই কোনো একক ক্যাম্পাস, সংগঠন, শ্রেণি কিংবা নেতৃত্বের সৃষ্টি ছিল না।

সমাজ অতীতকে ক্যামেরার মতো অবিকল সংরক্ষণ করে না। বর্তমানের প্রয়োজন, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যে অতীতকে বেছে নেয়, সাজায় এবং পুনরাবৃত্তি করে। স্মৃতিবিষয়ক সমাজতাত্ত্বিক আলোচনায় মরিস হালবওয়াক্স দেখিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত স্মৃতিও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে নির্মিত ও পুনর্গঠিত হয়। Maurice Halbwachs, On Collective Memory

যে মুখ সহজে প্রতীকে পরিণত হয়, যে স্থানকে স্মৃতিসৌধ করা যায় এবং যে কাহিনি সংক্ষিপ্ত মঞ্চভাষণে বলা সম্ভব—সেগুলো টিকে থাকে। ছড়িয়ে থাকা হাজার মানুষের ছোট কাজগুলো ধীরে ধীরে পেছনে চলে যায়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্মৃতি কোনো একটি আবাসিক হল, ভাস্কর্য বা কেন্দ্রীয় স্থানের মধ্যে জমা হয়নি। তা ছড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত ফোনে ধারণ করা ভিডিও, অনলাইন গ্রুপের বার্তা, মেডিকেল সেন্টার, নিরাপত্তাকর্মীদের সিদ্ধান্ত, পরিবারের ফোনকল এবং শিক্ষার্থীদের লেখা অ্যাসাইনমেন্টে।

ইতিহাস থেকে মানুষ শুধু তখনই হারায় না, যখন কোনো লেখক তাঁদের নাম বাদ দেন। কার অভিজ্ঞতা নথি হিসেবে সংরক্ষিত হবে, কার ফোনের ভিডিও হারিয়ে যাবে, কার স্মৃতিকথা একটি কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট হয়ে পড়ে থাকবে এবং কোন মুখ জাতীয় প্রতীকে পরিণত হবে—নীরবতা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয় সেখান থেকেই। ইতিহাসবিদ ও নৃবিজ্ঞানী মিশেল-রলফ ত্রুইয়ো ইতিহাস উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে এই নীরবতা তৈরির প্রক্রিয়া দেখিয়েছেন। Michel-Rolph Trouillot, Silencing the Past

রাষ্ট্রীয় বা আনুষ্ঠানিক আর্কাইভ সাধারণত ঘোষণাপত্র, নেতা, সংগঠন ও বড় ঘটনার সন্ধান করে। মানুষের আর্কাইভে থাকে অন্য জিনিস: কে গেট খুলেছিল, কে পানি দিয়েছিল, কে ফোন করে সতর্ক করেছিল, কে ঘর থেকে তথ্য পাঠিয়েছিল, কে চিকিৎসাসহায়তা সমন্বয় করেছিল এবং কে আহত অপরিচিত মানুষের পাশে বসেছিল।

এই ছোট স্মৃতিগুলো হারিয়ে গেলে আমরা হয়তো আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জি পাব, কিন্তু তার সামাজিক জীবনটি হারিয়ে ফেলব।

সংখ্যা ব্যাপ্তি জানায়, স্মৃতি জানায় মানুষ কীভাবে বদলেছিল

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। সংস্থাটি তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং ক্ষমতাসীন দলের সহিংস অংশগুলোর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের যুক্তিসংগত ভিত্তি পেয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর

এই সংখ্যার প্রয়োজন আছে। সংখ্যা সহিংসতার ব্যাপ্তি জানায়। কিন্তু সংখ্যা একা বলতে পারে না, একটি সাধারণ সকাল কীভাবে একজন শিক্ষার্থীর বাকি জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করেছিল—১৮ জুলাইয়ের আগে এবং ১৮ জুলাইয়ের পরে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভূমিকা স্মরণ করার অর্থ তাঁদের অবদানকে অন্যদের চেয়ে বড় করা নয়। শহীদ, আহত মানুষ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, স্কুল-কলেজের কিশোর, শ্রমজীবী মানুষ, নারী, পথচারী এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অবদানের প্রতিযোগিতা তৈরি করলে জুলাইয়ের বহুত্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

স্মরণের উদ্দেশ্য নতুন কোনো শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করা নয়। উদ্দেশ্য ইতিহাস থেকে কাউকে মুছে যেতে না দেওয়া।

বিপদের দিনে গেটের কোন পাশে ছিলাম?

দুই বছর পরে ১৮ জুলাইয়ের দিকে ফিরে তাকালে শুধু ধোঁয়ায় ঢাকা রাস্তা দেখা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে একটি খোলা গেট।

সেই গেট দিয়ে আতঙ্কিত শিক্ষার্থীরা আশ্রয়ে ঢুকেছিলেন। আবার সেই গেট দিয়েই বহু রাজনীতিবিমুখ তরুণ প্রথমবার বৃহত্তর নাগরিক জীবনে প্রবেশ করেছিলেন।

তাঁদের সবার নাম আমরা জানি না। হয়তো কখনো জানবও না। কিন্তু ইতিহাস শুধু পরিচিত নামের সমষ্টি নয়। ইতিহাস পানি বহন করা হাতেরও, আহত অপরিচিত মানুষের পাশে বসে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরও, ছাদ থেকে সতর্কবার্তা পাঠানো তরুণেরও, ঘরের ভেতর থেকে যাচাই করা তথ্য পাঠানো নারী শিক্ষার্থীরও এবং বিপদের মুখে দরজা বন্ধ না করা প্রতিষ্ঠানেরও।

একজন অংশগ্রহণকারী নিজের রূপান্তর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন:

“সেদিন আমি বুঝেছিলাম, মানুষকে শুধু তার প্রতিদিনের জীবন দেখে বিচার করা যায় না। পরিস্থিতি মানুষকে ভেঙে দেয়, আবার নতুন করেও তৈরি করে।”

জুলাই কারও একার উত্তরাধিকার নয়। কোনো দল, প্রতিষ্ঠান, শ্রেণি বা দৃশ্যমান নেতৃত্ব তার সম্পূর্ণ মালিক হতে পারে না। জুলাইকে স্মরণ করার অর্থ তাই নতুন কোনো মালিক তৈরি করা নয়; বরং যাঁরা এর নির্মাতা হয়েও ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাচ্ছেন, তাঁদের ইতিহাসে ফিরিয়ে আনা।

১৮ জুলাই আমাদের সামনে একটি স্থায়ী প্রশ্ন রেখে গেছে: বিপদের দিনে আমরা গেটের কোন পাশে ছিলাম—এবং গেটটি খোলা রেখেছিলাম, না বন্ধ?

কোনো সমাজের নৈতিক ইতিহাস শেষ পর্যন্ত হয়তো এই উত্তর দিয়েই লেখা হয়।


উৎস ও পদ্ধতি

এই লেখায় ব্যবহৃত নামহীন উদ্ধৃতিগুলো জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর পর শিক্ষার্থীদের লেখা প্রত্যক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক স্মৃতিকথা থেকে নির্বাচিত। অধিকাংশ মূল লেখা ইংরেজিতে ছিল; অর্থ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলা অনুবাদ এবং পাঠযোগ্যতার জন্য সামান্য ভাষাগত সম্পাদনা করা হয়েছে। লেখক, সহপাঠী ও পরিবারের গোপনীয়তা রক্ষায় নাম, শিক্ষার্থী আইডি এবং সহজে শনাক্তযোগ্য ব্যক্তিগত তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে।

উদ্ধৃতিগুলো একই ব্যক্তির ধারাবাহিক বক্তব্য নয়; এগুলো একাধিক অংশগ্রহণকারী ও প্রত্যক্ষদর্শীর কণ্ঠে নির্মিত একটি সমবেত স্মৃতি। ব্যক্তিগত স্মৃতিতে থাকা বহিরাগত দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব না হলে সেগুলো ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *