| | | | |

পিতৃতন্ত্রের প্রথম দাস কি পুরুষ শরীর? (শিশুর বিরুদ্ধে সমাজ | পর্ব ৪)

ছেলে মানুষ ধর্ষিত হয় না?

“ছেলে মানুষ। কিছু হয়নি।”

বাংলাদেশে একটি ছেলের বড় হয়ে ওঠার ইতিহাস লিখতে গেলে এই বাক্যটির কোনো না কোনো সংস্করণ প্রায় নিশ্চিতভাবেই সামনে আসবে। খেলতে গিয়ে পড়ে হাঁটু ছড়ে গেছে, সে কাঁদছে—“কাঁদিস না, ছেলে মানুষ।” অন্ধকারে ভয় পেয়েছে—“ছেলে হয়ে এত ভয়?” অপমান বা প্রত্যাখ্যানে ভেঙে পড়েছে—“এত নরম হলে চলবে?” শরীরের কোনো স্পর্শ তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে—“এত কিছু ভাবিস কেন?”

বাক্যগুলো আমরা সব সময় নিষ্ঠুরতা থেকে বলি না। অনেক সময় ভালোবেসেই বলি। ছেলেকে শক্ত করতে চাই, সাহসী করতে চাই, পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে শেখাতে চাই। কিন্তু ভালোবাসার ভাষাও কখনো সহিংস সামাজিক শিক্ষা বহন করতে পারে। ছেলেকে শক্ত হতে শেখাতে শেখাতে আমরা যদি তাকে ভয় গোপন করতে, ব্যথাকে তুচ্ছ করতে, নিজের শরীরের অস্বস্তিকে সন্দেহ করতে এবং সাহায্য চাইতে লজ্জা পেতে শেখাই, তাহলে একদিন সে সত্যিই ভয়ংকর কোনো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলে হয়তো প্রথমেই অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারবে না।

তার সঙ্গে কিছু ঘটেছে। কিন্তু তাকে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে—তার কিছু হওয়ার কথা নয়।

এই লেখার প্রশ্ন তাই শুধু ছেলেরা যৌন সহিংসতার শিকার হয় কি না, তা নয়। তার চেয়েও অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো: যে শরীরকে আমরা দুর্বল হতে দিই না, সেই শরীর আক্রান্ত হলে তাকে ভুক্তভোগী হিসেবে চিনব কীভাবে?

এখানেই পিতৃতন্ত্রের একটি কম আলোচিত নিষ্ঠুরতা আছে। পিতৃতন্ত্র নারীর ওপর পুরুষের ক্ষমতার ব্যবস্থা—এ কথা সত্য। কিন্তু এখানেই তার কাজ শেষ হয় না। কোনো ক্ষমতার ব্যবস্থা শুধু কাদের ওপর শাসন করা হবে তা নির্ধারণ করে না; যারা সেই ব্যবস্থার ক্ষমতার বাহক হবে, তাদেরও তৈরি করে। পিতৃতন্ত্র তাই শুধু “নারী” তৈরি করে না; সে বিশেষ ধরনের “পুরুষ”ও তৈরি করে।

এই অর্থেই আমি বলছি—পিতৃতন্ত্রের প্রথম দাস পুরুষ শরীর।

“প্রথম” এখানে কোনো victimhood-এর প্রতিযোগিতা নয়। পুরুষ নারীর চেয়ে বেশি নিপীড়িত—এমন কথা বলার প্রশ্নই আসে না। বরং যে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরুষকে ক্ষমতার প্রতিনিধি বানাতে চায়, সেই ব্যবস্থাকে প্রথমেই পুরুষের শরীরকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। তাকে শেখাতে হয় কীভাবে দাঁড়াতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, কতটুকু ভয় দেখানো যাবে, কতটুকু ভয় লুকাতে হবে, কোন আবেগ পুরুষের জন্য গ্রহণযোগ্য, কোনটি নয়। ক্ষমতার আসনে বসার আগে পুরুষ শরীরকে ক্ষমতার উপযোগী শরীরে পরিণত হতে হয়।

এই প্রশিক্ষণের মূল্য আছে।

পিতৃতন্ত্রের প্রয়োজন এমন পুরুষ, যে শক্ত; এমন পুরুষ নয়, যে নিজের vulnerability বুঝতে পারে। তার প্রয়োজন রক্ষক, আক্রান্ত ব্যক্তি নয়; আক্রমণ করতে সক্ষম শরীর, আক্রমণের শিকার শরীর নয়; যৌনতায় সক্রিয় শরীর, অনিচ্ছুক বা জবরদস্তির শিকার শরীর নয়।

ফলে পিতৃতন্ত্রের তৈরি আদর্শ পুরুষ-শরীরটি এক ধরনের অভেদ্য শরীর।

তার ওপর কিছু ঘটে না।

সে অন্যকে রক্ষা করে, তাকে রক্ষা করতে হয় না। সে যৌনতায় প্রবেশ করে, তার শরীরে কেউ প্রবেশ করতে পারে—এই কল্পনাই পুরুষত্বের পরিচিত ছবিকে অস্বস্তিতে ফেলে। সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে; পরিস্থিতি তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

Connell ও Messerschmidt যে hegemonic masculinity বা প্রভাবশালী পুরুষত্বের আদর্শ নিয়ে লিখেছেন, তার কেন্দ্রে আছে এই সামাজিক নির্মাণ: সব পুরুষ এমন নয়, কিন্তু “সত্যিকারের পুরুষ” কেমন হওয়া উচিত—তার একটি শক্তিশালী মানদণ্ড সমাজ তৈরি করে। শক্তি, নিয়ন্ত্রণ, heterosexual competence, আত্মনির্ভরতা ও vulnerability গোপন করা সেই আদর্শের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই আদর্শ পুরুষদের শুধু privilege দেয় না; তাদের আচরণের সীমাও নির্ধারণ করে।

সেই কারণেই একটি ছেলে যৌন সহিংসতার শিকার হলে সে কেবল একজন অপরাধীর সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে না। তার শরীর সংঘর্ষে পড়ে “পুরুষ” শব্দটির সামাজিক অর্থের সঙ্গেও।

তার victimhood স্বীকার করতে গেলে আমাদের স্বীকার করতে হবে—পুরুষও অসহায় হতে পারে। পুরুষও ভয় পেয়ে জমে যেতে পারে। পুরুষও overpower হতে পারে। পুরুষের শরীরও জবরদস্তির জায়গা হতে পারে। পুরুষেরও consent আছে। সেই consent-ও লঙ্ঘিত হতে পারে।

এই সত্যটি পিতৃতান্ত্রিক পুরুষত্বের জন্য গভীরভাবে অস্বস্তিকর।

তাই অনেক সময় অপরাধীর আচরণের আগে প্রশ্ন ওঠে victim-এর পুরুষত্ব নিয়ে। সে পালায়নি কেন? প্রতিরোধ করল না কেন? এত শক্ত ছেলে—তার সঙ্গে এটা হলো কীভাবে? তার শরীর কোনো শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে কি না? যেন অপরাধের প্রধান রহস্য perpetrator-এর সহিংসতা নয়, victim-এর “যথেষ্ট পুরুষ” হতে না পারা।

এভাবেই পিতৃতন্ত্র পুরুষকে একটি অসম্ভব দায়িত্ব দেয়—সব সময় অভেদ্য থাকার দায়িত্ব।

আর যে শরীরের vulnerable হওয়ার অধিকার নেই, সেই শরীরের victim হওয়ার অধিকারও খুব সহজে থাকে না।

প্রায় তিন কোটি ছেলে: কোন পুরুষদের আমরা তৈরি করছি?

এই আলোচনা কোনো ছোট জনগোষ্ঠী নিয়ে নয়।

UNICEF-এর Bangladesh data অনুযায়ী ২০২২ সালের Population and Housing Census-এ দেশে ০–১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৮৭ লাখ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ।

এর মধ্যে ছেলে শিশু কত—এই প্রশ্নটির একটি আনুমানিক উত্তরও আমাদের scale বুঝতে সাহায্য করে। United Nations Population Division-এর age-sex estimate-এ বাংলাদেশে ০–১৪ বছরের ছেলে প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ; ১৫–১৯ বছরের ছেলে প্রায় ৮৫ লাখ ৩৬ হাজার। ১৫–১৯-এর পাঁচ বছরের band-এর মধ্যে ১৫–১৭ বছরকে খুব মোটামুটি তিন-পঞ্চমাংশ ধরে নিলে আরও প্রায় ৫১ লাখ ছেলে যোগ হয়। অর্থাৎ ০–১৭ বছর বয়সী ছেলের সংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটি ৩ লাখের কাছাকাছি। এটি একটি rough demographic estimate, official Census under-18 male total নয়: ২.৫১৩ কোটি + (০.৮৫৩৬ কোটি × ৩/৫) ≈ ৩.০২৬ কোটি। UN-এর age-sex table-ও এই আনুমানিকতার ভিত্তি দেয়।

তিন কোটি ছেলে।

সংখ্যাটি একবার মাথায় রাখা দরকার।

আজ যারা শিশু, আগামী দুই দশকে তারা বাংলাদেশের পুরুষ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ হবে। তারা প্রেম করবে, বিয়ে করবে, বাবা হবে। শিক্ষক হবে, শ্রমিক হবে, চিকিৎসক হবে, চালক হবে, ব্যবসায়ী হবে, সাংবাদিক হবে, পুলিশ হবে, সেনাসদস্য হবে, বিচারক হবে, ইমাম হবে, প্রশাসক হবে, রাজনীতিবিদ হবে। তাদের কেউ প্রতিষ্ঠান চালাবে, কেউ পরিবার, কেউ রাষ্ট্রের কোনো অংশ।

তাই ছেলে শিশুর শরীর নিয়ে আজকের আচরণ কেবল “শিশু সুরক্ষা”র প্রশ্ন নয়। এটি আগামী সমাজ কোন ধরনের পুরুষের হাতে যাবে, সেই প্রশ্নও।

বাংলাদেশে শিশুদের শরীর কী ধরনের disciplinary environment-এর মধ্যে বড় হয়, তার একটি কঠিন ইঙ্গিত দেয় ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey। সেখানে ১–১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ আগের এক মাসে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের কোনো না কোনো রূপের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। Sex-disaggregated preliminary data-তে ছেলেদের ক্ষেত্রে হারটি প্রায় ৮৭ শতাংশ, মেয়েদের প্রায় ৮৫ শতাংশ। এটি sexual violence-এর পরিসংখ্যান নয়—দুটিকে এক করা একেবারেই উচিত হবে না। কিন্তু এটি দেখায়, শিশুর শরীরকে ভয়, শাস্তি, চিৎকার, আঘাত এবং কর্তৃত্বের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা আমাদের সামাজিক জীবনে কতটা স্বাভাবিকীকৃত।

একটি ছেলে যদি এমন সামাজিক পরিবেশে বড় হয়, যেখানে শরীরের ব্যথাকে ছোট করা হয়, কান্নাকে দুর্বলতা বলা হয়, কর্তৃত্বের সামনে নীরবতা শেখানো হয়, এবং পরে sexual violation-এর অভিজ্ঞতাকেও বলা হয় “ভুলে যা”—তাহলে সে শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার স্মৃতি বহন করে না। সে কিছু শিক্ষা বহন করে।

সে শিখতে পারে নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক। সাহায্য চাওয়া মানে নিজেকে দুর্বল ঘোষণা করা। ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ নেই। শরীরের সীমা ভাঙা গেলেও চুপ থাকা যায়। কষ্টের ভাষা না থাকাই পুরুষত্ব।

এই জায়গায় খুব সতর্ক থাকা দরকার। Sexual abuse-এর শিকার কোনো ছেলে বড় হয়ে সহিংস পুরুষ, অপরাধী বা “সমস্যাজনক নাগরিক” হবেই—এমন কোনো সরল বা বৈজ্ঞানিক সমীকরণ নেই। এমন দাবি survivor-দের ওপর নতুন stigma তৈরি করবে। বহু survivor সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলেন, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল জীবনযাপন করেন, চিকিৎসা, ভালোবাসা, সামাজিক স্বীকৃতি ও supportive relationship-এর মাধ্যমে healing এবং post-traumatic growth-এর অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। Male survivors-এর intimate relationship নিয়ে qualitative synthesis-এ relational difficulty-এর পাশাপাশি healing through love এবং agency পুনর্গঠনের উদাহরণও পাওয়া গেছে।

কিন্তু “সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না” বলার অর্থ “ক্ষতের সামাজিক মূল্য নেই”—এটিও নয়।

Childhood sexual abuse-এর দীর্ঘমেয়াদি ফল নিয়ে ১৯টি meta-analysis, ৫৫৯টি primary study এবং ৪০ লাখেরও বেশি participant-এর evidence একত্র করা একটি বড় umbrella review-এ examined ২৮টি outcome-এর ২৬টির সঙ্গে childhood sexual abuse-এর association পাওয়া গেছে। এর মধ্যে anxiety, depression, substance misuse-সহ psychiatric, psychosocial ও physical-health outcome ছিল। গবেষকেরা causal claim নিয়ে যথাযথ সতর্কতা রেখেছেন, কিন্তু long-term burden যে বাস্তব—তার প্রমাণ শক্তিশালী।

২০২৬ সালের meta-analysis আবার childhood sexual abuse-এর সঙ্গে adulthood-এ attachment anxiety এবং attachment avoidance-এর উল্লেখযোগ্য association পেয়েছে। অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আস্থা ও নিরাপদ emotional connection তৈরির ক্ষেত্রেও childhood experience দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে—যদিও প্রত্যেক survivor-এর outcome একই নয়।

Male survivors নিয়ে qualitative research-এ intimacy difficulty, alienation, emotional discomfort, anger, trust এবং boundary নিয়ে সমস্যার পাশাপাশি recovery-র পথও উঠে এসেছে। নিরাপদ সম্পর্ক, healthy boundary, নিজের অভিজ্ঞতার অর্থ তৈরি করা এবং গ্রহণযোগ্যতার অভিজ্ঞতা survivors-কে healing-এর দিকে নিতে পারে।

এখানেই “ভবিষ্যতের নাগরিক” প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একজন নাগরিক শুধু ভোটার নয়। নাগরিকতা মানে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, অন্যের সীমা বোঝা, নিজের সীমা প্রকাশ করা, অন্যায় হলে কথা বলা, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া, প্রতিষ্ঠানকে বিশ্বাস করার মতো অভিজ্ঞতা থাকা এবং ক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষি করার ভাষা জানা।

আমরা যদি ছেলেকে শৈশব থেকে শেখাই—কাঁদবে না, ব্যথা প্রকাশ করবে না, সাহায্য চাইবে না, authority-র বিরুদ্ধে কথা বলবে না—তাহলে বিশ বছর পরে সেই একই মানুষের কাছে হঠাৎ করে emotionally literate, consent-respecting, সহমর্মী, institution-trusting নাগরিকত্ব আশা করা একটি গভীর সামাজিক বৈপরীত্য।

Trauma কোনো অপরাধীর কারখানা নয়। কিন্তু অস্বীকৃত trauma, shame এবং বাধ্যতামূলক নীরবতা একটি সমাজের relational culture-এর ওপর মূল্য চাপাতে পারে।

সহিংসতা সব সময় একই ঘটনা হিসেবে প্রজন্মান্তরে যায় না। অনেক সময় যায় একটি ব্যাকরণ হিসেবে।

“চুপ করো।”

“দুর্বল হয়ো না।”

“বিশ্বাস করো না।”

“কাঁদিস না।”

“ছেলে মানুষ।”

একদিন সেই শিশুই বাবা হয়, এবং কোনো এক দুপুরে তার নিজের ছেলে পড়ে গিয়ে কাঁদলে অজান্তেই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—

“কিছু হয়নি।”

তখন একটি ক্ষত শুধু স্মৃতি হিসেবে নয়, পুরুষত্বের সামাজিক ভাষা হিসেবে প্রজন্ম অতিক্রম করে।

ধর্ষিত শরীর, কিন্তু ভুক্তভোগী নয়

এখানে আরেকটি সমস্যা তৈরি হয়। কোনো মানুষের ওপর সহিংসতা ঘটেছে মানেই সমাজ তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে victim হিসেবে স্বীকৃতি দেবে—এমন নয়।

Nils Christie-র বহুল আলোচিত “ideal victim” ধারণা এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে। কিছু ব্যক্তি, কিছু শরীর এবং কিছু পরিস্থিতি সমাজের পরিচিত victim-image-এর সঙ্গে বেশি মেলে; ফলে তাদের victimhood সহজে বিশ্বাসযোগ্য হয়। অন্যরা সেই পরিচিত ছবির বাইরে পড়ে যায়।

আমাদের ভুক্তভোগীর সামাজিক ছবিটি প্রায়ই দুর্বলতার ছবি: যে ভয় পেয়েছে, যার ক্ষমতা কম, যে প্রতিরোধ করতে পারেনি।

পুরুষের সামাজিক ছবিটি প্রায় বিপরীত: শক্তিশালী, নিয়ন্ত্রণে, প্রতিরোধক্ষম, যৌনতায় সক্রিয়।

এই দুই পরিচয় যখন একই শরীরে এসে বসে, আমাদের সামাজিক কল্পনা হোঁচট খায়।

এই অবস্থাটিকেই আমি বলছি অপাঠ্য ভুক্তভোগী শরীর—illegible victim body।

শরীর আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু আমরা তাকে আক্রান্ত শরীর হিসেবে পড়তে পারছি না।

ছেলেটি নিজেই হয়তো বুঝতে পারছে না, “আমার সঙ্গে আসলে কী হয়েছে?” পরিবার ভাবতে পারে, “তুই তো ছেলে।” বন্ধু বিষয়টিকে হাসির গল্পে নামিয়ে আনতে পারে। প্রতিষ্ঠান ঘটনাটিকে এমন কোনো হালকা নামে ডাকতে পারে, যাতে violence শব্দটি আর উচ্চারণ করতে না হয়।

Male sexual victimisation নিয়ে গবেষণার critical synthesis-এ দেখা গেছে, প্রচলিত gender role, rape myth এবং sexual script male survivors-এর self-identification ও help-seeking-কে বাধাগ্রস্ত করে। পুরুষকে dominant ও sexually active হিসেবে কল্পনা করা এবং নারীকে তুলনামূলকভাবে সহজে “ideal victim” হিসেবে দেখা male victimhood-কে সাংস্কৃতিকভাবে অস্বস্তিকর করে তোলে।

এই অস্বস্তির সবচেয়ে নির্মম প্রকাশগুলোর একটি হলো শরীরের involuntary physiological response-কে consent হিসেবে পড়া। Sexual assault-এর সময় পুরুষের শরীরে erection বা ejaculation ঘটতে পারে—এটি সম্মতির প্রমাণ নয়। শরীর অনেক প্রতিক্রিয়াই ইচ্ছার বাইরে তৈরি করতে পারে।

শরীরের প্রতিক্রিয়া আর শরীরের সম্মতি এক জিনিস নয়।

কিন্তু পুরুষকে যদি আমরা সব সময় sexually willing body হিসেবে কল্পনা করি, তাহলে এই সহজ সত্যটিও ধোঁয়াশা হয়ে যায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় homophobia। বিশেষ করে কোনো ছেলে বা পুরুষ অন্য একজন পুরুষের যৌন সহিংসতার শিকার হলে assault-এর সঙ্গে তার sexual orientation-কে গুলিয়ে ফেলা হয়। “তাহলে কি সে gay?”—প্রশ্নটিই দেখায় আমরা জবরদস্তি এবং আকাঙ্ক্ষার পার্থক্য কত সহজে হারিয়ে ফেলি।

যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া কারও sexual orientation নির্ধারণ করে না। জবরদস্তি কোনো পরিচয় নয়।

কিন্তু survivor তখন শুধু বলতে বাধ্য হয় না—“আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।” তাকে যেন একই সঙ্গে প্রমাণ করতে হয়—

“আমি এখনো পুরুষ।”

এই হলো পিতৃতন্ত্রের নির্মম ফাঁদ।

সহিংসতার আগে সে বলে: তোমার কিছু হওয়ার কথা নয়।

সহিংসতার পরে বলে: যেহেতু তোমার কিছু হওয়ার কথা নয়, তাই যা হয়েছে সেটিও হয়তো সত্যিকারের সহিংসতা নয়।

আইন যখন বলে কার শরীর ধর্ষিত হতে পারে

সমাজ অস্পষ্ট ভাষায় কাজ করতে পারে। আইন সংজ্ঞা দিয়ে কাজ করে। আর একটি সহিংসতার আইনি নাম শুধু শব্দ নয়—ন্যায়বিচারে প্রবেশের পথও।

বাংলাদেশের বর্তমান Penal Code, 1860-এর ৩৭৫ ধারার ভাষা খুব পরিষ্কার: “A man” নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে “a woman”-এর সঙ্গে sexual intercourse করলে rape সংঘটিত হয়। অর্থাৎ দণ্ডবিধির মৌলিক rape definition perpetrator-কে পুরুষ এবং victim-কে নারী হিসেবে নির্মাণ করে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সেই সংজ্ঞায় rape victim হিসেবে জায়গা পান না।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এর অর্থ এই নয় যে adult male-এর বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রতিটি sexual assault বাংলাদেশের প্রতিটি criminal provision-এর বাইরে। নির্দিষ্ট ঘটনায় অন্য ধারা প্রযোজ্য হতে পারে। কিন্তু সমস্যাটি হলো—ধর্ষণের মৌলিক legal category-টি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ victim-কে একই নামে স্বীকার করে না।

তবে বাংলাদেশের আইন গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন করেছে।

২০২৬ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন “বলাৎকার” নামে নতুন সংজ্ঞা যোগ করেছে: কোনো ছেলে শিশুর মুখ বা পায়ুপথে নির্দিষ্ট যৌনকর্ম সংঘটিত হলে তা বলাৎকার। একই সঙ্গে সংশোধিত ধারা ৯-এর উদ্দেশ্যে “ধর্ষণ” অর্থের মধ্যে বলাৎকারকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এটি ছোট পরিবর্তন নয়।

বাংলাদেশের আইন এখন স্বীকার করছে—ছেলে শিশুর শরীরও ধর্ষণের শিকার হতে পারে।

কিন্তু এই স্বীকৃতির ভেতরেই একটি নতুন প্রশ্ন অপেক্ষা করছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এ “শিশু” বলতে অনধিক ষোল বছর বয়সী ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে। অন্যদিকে শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৪ স্পষ্টভাবে বলে, ওই আইনের উদ্দেশ্যে অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু।

দুটি আইনের উদ্দেশ্য আলাদা, তাই একে সরল “আইনি বিরোধ” বলা যথার্থ হবে না। কিন্তু victim recognition-এর দিক থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাগত বিচ্ছেদ।

১৭ বছরের একজন ছেলে শিশু আইন অনুযায়ী শিশু। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের “শিশু” সংজ্ঞার মধ্যে সে আর নেই।

আরও সূক্ষ্ম drafting tension আছে: সংজ্ঞায় বলা হয়েছে “অনধিক ষোল”, কিন্তু ধারা ৯-এর explanation-এ ব্যবহৃত হয়েছে “ষোল বৎসরের কম বয়সের” শিশু। ঠিক ১৬ বছর বয়সের boundary-র doctrinal interpretation আদালত ও আইনজ্ঞদের বিষয়; এখানে সেটির নিষ্পত্তি করছি না।

কিন্তু সামাজিক প্রশ্নটি এড়ানো যায় না।

একটি জন্মদিন কি শরীরের vulnerability বদলে দেয়?

১৫ বছর ১১ মাস বয়সে যে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক কাজ করছিল, ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে পৌঁছেই কি তা উধাও হয়ে যায়?

Trauma কি জন্মনিবন্ধন দেখে?

এই জায়গাটিকে বলা যায় বয়সের আইনি খাদ।

আর তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে adult male victim-এর আরও বড় শূন্যতা।

Bangladesh নিয়ে International Journal of Legal Information-এ প্রকাশিত গবেষণা adult male rape survivors, তাদের স্বজন, পুলিশ কর্মকর্তা ও legal practitioners-এর narrative data বিশ্লেষণ করে সরাসরি একটি “legal definition vacuum” চিহ্নিত করেছে। গবেষণাটি gender-neutral rape definition-এর অনুপস্থিতিকে police-support response-এর ঘাটতি এবং complainant-দের general diary বা অন্য adjacent complaint-এর দিকে ঠেলে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

অর্থাৎ আইন এগিয়েছে, কিন্তু অসম্পূর্ণভাবে।

ছেলে শিশুর শরীরকে এখন অন্তত কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষিত শরীর হিসেবে পড়া হচ্ছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে সেই স্বীকৃতি এখনো সমতুল্য নয়।

আইন ছেলে শিশুর শরীরকে আংশিকভাবে পড়তে শিখেছে; প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ধর্ষিত শরীরকে এখনো একই ভাষায় পড়তে শেখেনি।

এখানেই feminism নিয়ে একটি সতর্ক কথা প্রয়োজন। Male victimhood-এর অদৃশ্যতার দায় feminism-এর ওপর চাপানো সহজ, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। Sexual violence-কে private shame, “সম্ভ্রমহানি” বা ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্যের ভাষা থেকে বের করে power, coercion, consent এবং bodily autonomy-র রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করার ক্ষেত্রে feminist scholarship ও activism-এর ভূমিকা মৌলিক।

Male rape-এর প্রশ্ন সেই অর্জনের বিরুদ্ধে নয়; বরং তার নৈতিক পরিসর বাড়ানোর দাবি।

Consent যদি নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়, ছেলের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। Bodily autonomy যদি মানুষের অধিকার হয়, পুরুষের শরীরও তার বাইরে নয়। জবরদস্তি যদি অন্যায় হয়, victim-এর gender বদলালে সেই অন্যায় বদলে যায় না।

Male rape নিয়ে gender scholarship-ও দেখিয়েছে, পুরুষ victim-কে অস্বীকার করা feminism-এর কোনো অপরিহার্য ফল নয়; বরং সেই hegemonic masculinity-রই একটি প্রকাশ, যা পুরুষকে victim হওয়ার অনুমতি দেয় না।

সুতরাং প্রশ্নটি feminism বনাম men নয়।

বরং প্রশ্নটি হলো—আমাদের মুক্তির ভাষা কি এমন সব আহত শরীরকেও ধারণ করতে পারে, যাদের আমরা আগে victim হিসেবে পড়তেই শিখিনি?

যে পুরুষ কাঁদতে শেখেনি

এবার আবার প্রথম বাক্যটির কাছে ফিরে আসি।

“ছেলে মানুষ। কিছু হয়নি।”

হয়তো আমরা ভালোবেসে বলেছি। কিন্তু সামাজিক বাক্যের জীবন আমাদের উদ্দেশ্যের চেয়েও দীর্ঘ।

যে ছেলেকে বারবার বলা হয় তার ব্যথা ছোট, সে নিজের বড় ব্যথাও ছোট করতে শিখতে পারে। যাকে কাঁদতে দেওয়া হয় না, তার কান্না একসময় অন্যদের কাছেও অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। যাকে শেখানো হয় সে vulnerable নয়, সে সত্যিই vulnerable হয়ে পড়লে আমরা তাকে চিনতে পারি না।

তখন নীরবতা আর শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না।

নীরবতা সামাজিকভাবে তৈরি হয়।

একদিকে victim-এর ভয়, অন্যদিকে পুরুষত্বের দাবি; সঙ্গে পরিবারে সম্মান, sexuality নিয়ে stigma, আইনের category, প্রতিষ্ঠানের সুনাম, অপরাধীর ক্ষমতা।

সব মিলিয়ে survivor-এর সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়াতে পারে নিজের অভিজ্ঞতার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য নাম খুঁজে পাওয়া।

এ কারণেই “অপাঠ্য ভুক্তভোগী শরীর” শুধু male rape বোঝার ধারণা নয়। এটি আমাদের সমাজকে পড়ারও একটি উপায়।

কার কান্নাকে আমরা সত্যি মনে করি?

কার ভয়কে গুরুত্ব দিই?

কোন শরীরকে আমরা বলি, “হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে”?

আর কাকে বলি—

“তুমি তো ছেলে”?

ধর্ষণের শিকার হওয়া একটি ঘটনা। কিন্তু “আমি ধর্ষণের শিকার” বলে স্বীকৃতি পাওয়াও একটি সামাজিক ও আইনি প্রক্রিয়া।

এ কারণেই ন্যায়বিচারের লড়াই থানায় শুরু হয় না। শুরু হয় তারও আগে—যে মুহূর্তে একটি শিশু সিদ্ধান্ত নেয় সে কি কথাটি কাউকে বলবে; যে মুহূর্তে বাবা-মা সিদ্ধান্ত নেন, তারা শুনবেন না চুপ করাবেন; যে মুহূর্তে প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয় victim-এর পাশে দাঁড়াবে, নাকি নিজের reputation বাঁচাবে; যে মুহূর্তে সমাজ সিদ্ধান্ত নেয় একটি পুরুষ-শরীরকে vulnerable হওয়ার অনুমতি দেবে কি না।

এই জায়গায় “পিতৃতন্ত্রের প্রথম দাস” কথাটির অর্থ আবার পরিষ্কার হয়।

পিতৃতন্ত্র পুরুষকে ক্ষমতা দেওয়ার আগে তাকে একটি চুক্তিতে বাধ্য করে: শক্ত থাকবে, কাঁদবে না, ভয় স্বীকার করবে না, নিজের ক্ষতের কথা বলবে না। বিনিময়ে তাকে “পুরুষ” বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।

কিন্তু এই চুক্তির মূল্য ভয়ংকর।

কারণ তখন একজন ছেলে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া সহিংসতার বিচার চাইতে গেলেও প্রথমে তাকে সেই চুক্তি ভাঙতে হয়।

তাকে বলতে হয়—

আমি পুরুষ।

এবং আমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।

আমি ভয় পেয়েছি।

আমি প্রতিরোধ করতে পারিনি।

আমার শরীর আমার অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে।

আমার সাহায্য দরকার।

এই বাক্যগুলো উচ্চারণ করতে পারা দুর্বলতা নয়। বরং পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্ভবত সবচেয়ে গভীর বিদ্রোহগুলোর একটি।

কারণ পিতৃতন্ত্রের প্রয়োজন পাথরের পুরুষ।

মানবিক সমাজের প্রয়োজন মানুষ।

এমন মানুষ, যে নিজের vulnerability বুঝতে পারে এবং তাই অন্যের vulnerability-ও চিনতে পারে; যে নিজের সীমা জানে এবং অন্যের সীমা মানে; যে সাহায্য চাইতে পারে এবং অন্যের সাহায্যের আবেদনকে উপহাস করে না; যে ছেলের কান্না শুনে তাকে সঙ্গে সঙ্গে “পুরুষ” বানাতে যায় না।

প্রায় তিন কোটি ছেলে আজ আমাদের সামনে বড় হচ্ছে।

প্রশ্ন শুধু তাদের কতজন ভালো স্কুলে যাবে, কতজন চাকরি পাবে, কতজন GDP-তে অবদান রাখবে—তা নয়।

প্রশ্ন হলো, আমরা তাদের কী ধরনের পুরুষ হতে শেখাচ্ছি?

যে নিজের ভয়কে চিনবে?

নাকি যে ভয়কে রাগে রূপান্তর করা ছাড়া কোনো ভাষা জানবে না?

যে consent বুঝবে?

নাকি যে পুরুষত্বকে সবসময় sexual entitlement-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবে?

যে ছেলের কান্না শুনবে?

নাকি নিজের অস্বীকৃত শৈশব থেকে একই বাক্য আবার বলবে—

“কিছু হয়নি”?

Trauma কোনো predetermined destiny নয়। তাই survivor-কে ভবিষ্যৎ বিপজ্জনক পুরুষ হিসেবে দেখাও অন্যায়। কিন্তু society-র দায়িত্ব এখানেই: ক্ষতকে অস্বীকার না করা, চিকিৎসা ও নিরাপদ disclosure-এর সুযোগ তৈরি করা, আইনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করা, এবং এমন পুরুষত্বের ধারণা তৈরি করা যেখানে মানুষ vulnerable হয়েও মর্যাদাবান থাকতে পারে।

এই কারণে ছেলে শিশুর sexual victimisation কোনো “পুরুষদের আলাদা ইস্যু” নয়।

এটি child protection-এর প্রশ্ন।

Gender justice-এর প্রশ্ন।

Public health-এর প্রশ্ন।

পরিবারের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

এবং শেষ পর্যন্ত—বাংলাদেশ কেমন নাগরিক তৈরি করবে, সেই প্রশ্ন।

কোনো ছেলে কাঁদলে তাই আমাদের প্রথম কাজ তাকে “পুরুষ” বানানো নয়।

প্রথম কাজ তার কথা শোনা।

কারণ সে হয়তো শুধু কাঁদছে না।

সে হয়তো বহু কষ্টে এমন একটি বাক্য বলার চেষ্টা করছে, যেটি আমাদের সমাজ তাকে বলতে শেখায়নি—

আমার কিছু হয়েছে।

আর যদি আমরা তখনও উত্তর দিই, “ছেলে মানুষ, কিছু হয়নি”, তাহলে আমরা শুধু একটি শিশুর অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করছি না। আমরা এমন এক পুরুষত্ব তৈরি করছি যার ক্ষত আছে কিন্তু ক্ষতের ভাষা নেই; যার শরীরে সহিংসতা ঘটতে পারে কিন্তু victim হওয়ার অনুমতি নেই; যে বড় হবে, কিন্তু নিজের শৈশবের নীরবতাকে সঙ্গে নিয়ে বড় হবে।

একটি সমাজ কতটা মানবিক, তা শুধু ধর্ষণের জন্য সে কত কঠোর শাস্তি রেখেছে দিয়ে বোঝা যায় না।

দেখতে হয় সে কত ধরনের ধর্ষিত শরীরকে চিনতে পারে।

কার কান্নাকে বিশ্বাস করে।

কার ভয়কে গুরুত্ব দেয়।

কার শরীরকে বলতে পারে—

হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে।

আর এখানেই পরের প্রশ্নটি আরও ভয়ংকর।

যে ছেলে শিশুর শরীর এমনিতেই victim হিসেবে কম পাঠযোগ্য, তার বিপরীতে যদি দাঁড়িয়ে থাকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান—স্কুল, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, পরিবার, ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা অন্য কোনো সংগঠন—যার আছে সামাজিক মর্যাদা, অর্থ, অনুসারী, যোগাযোগ এবং নিজের সুনাম রক্ষার প্রবল প্রয়োজন?

তখন কি শুধু শিশুটির কথা অবিশ্বাস করা হয়?

নাকি প্রতিষ্ঠানকে বাঁচাতে গিয়ে ধীরে ধীরে—

শিশুটিকেই অভিযুক্ত বানিয়ে দেওয়া হয়?

পর্ব ৫ শুরু হবে ঠিক সেখান থেকে।

তথ্যসূত্র

Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) & UNICEF. Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey 2025. Violent discipline indicators.

Connell, R. W., & Messerschmidt, J. W. (2005). “Hegemonic Masculinity: Rethinking the Concept.” Gender & Society, 19(6), 829–859.

Depraetere, J., Vandeviver, C., Vander Beken, T., & Keygnaert, I. (2020). “Big Boys Don’t Cry: A Critical Interpretive Synthesis of Male Sexual Victimization.” Trauma, Violence, & Abuse, 21(5), 991–1010. DOI: 10.1177/1524838018816979.

Hailes, H. P., Yu, R., Danese, A., & Fazel, S. (2019). “Long-term Outcomes of Childhood Sexual Abuse: An Umbrella Review.” The Lancet Psychiatry, 6(10), 830–839. DOI: 10.1016/S2215-0366(19)30286-X.

Pastor-Cerezo, V., & Iborra Cuéllar, A. (2026). “The Association Between Childhood Sexual Abuse and Adult Attachment: A Meta-Analytic Review.” Trauma, Violence, & Abuse. DOI: 10.1177/15248380261439134.

Weetman, C., Kiemle, G., Lowe, M., & Balfour, R. (2022). “The Experience of Partner Relationships for Male Survivors of Childhood Sexual Abuse: A Qualitative Synthesis.” Trauma, Violence, & Abuse, 23(5), 1478–1493. DOI: 10.1177/1524838021998311.

Alam, M. T., Abbas, A., Mutmainnah, I., & Tonny, S. A. “Addressing the Legal Void: Ensuring Justice for Adult Male Rape Victims in Bangladesh.” International Journal of Legal Information, 51(2), 105–116. DOI: 10.1017/jli.2023.20.

UNICEF Bangladesh. “Data on the Situation of Children in Bangladesh.” Child population based on Population and Housing Census 2022.

United Nations Population Division. World Population Prospects 2022, Bangladesh age-sex population estimates.

Government of Bangladesh. The Penal Code, 1860, Section 375.

Government of Bangladesh. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, ধারা ২ ও ৯; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬ দ্বারা সংশোধিত।

Government of Bangladesh. শিশু আইন, ২০১৩, ধারা ৪।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *