গরিবের বাচ্চার শরীরের দাম কত? (শিশুর বিরুদ্ধে সমাজ | পর্ব ৩)
শ্রেণি, খরচযোগ্য শৈশব এবং অরক্ষিত শরীরের রাজনৈতিক অর্থনীতি
একই বয়সের দুই শিশুর একজনকে আমরা বলি, “তুমি ছোট”; অন্যজনকে বলি, “এত বড় হয়েছ, এইটুকু কাজ পারো না?” এই পার্থক্য শুধু দারিদ্র্যের নয়। এর ভেতরে আছে একটি সমাজের সিদ্ধান্ত—কোন শিশুর শৈশব ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা হবে, আর কোন শিশুর শৈশব বর্তমানেই খরচ করে ফেলা যাবে।
ধরা যাক, দুজনের বয়সই দশ।
প্রথম শিশুটি সকালে স্কুলে যাবে। তার মা তার ব্যাগ গুছিয়ে দিয়েছেন। ভারী পানির বোতলটি হাতে নিতে গেলে বাবা হয়তো বললেন—
“থাক, তুমি ছোট। আমি দিচ্ছি।”
বিকেলে সে খেলতে যাবে। রাতে পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লে কেউ তার গায়ে চাদর টেনে দেবে।
এবার একই বয়সের আরেকটি শিশুকে ভাবুন।
সকাল থেকে সে একটি বাসায় কাজ করছে। প্লেট ধুয়েছে, ঘর মুছেছে, বাজারের ব্যাগ তুলেছে। ভারী কিছু তুলতে একটু দেরি হলে তাকে বলা হলো—
“এত বড় হয়েছ, এইটুকু কাজও পারো না?”
একই বয়স।
একই দশ বছর।
অথচ একজনের ক্ষেত্রে দশ বছর মানে—এখনও ছোট।
অন্যজনের ক্ষেত্রে দশ বছর মানে—এত বড় হয়েছ।
প্রশ্নটি এখান থেকেই শুরু করা দরকার।
একই বয়সে একজন কেন শিশু, আরেকজন কেন শ্রমিক?
আমরা শ্রেণির পার্থক্য বুঝি বাড়ি দিয়ে, গাড়ি দিয়ে, স্কুল দিয়ে, পোশাক দিয়ে, হাসপাতাল দিয়ে। কিন্তু শ্রেণি আরও গভীর একটি জিনিস ভাগ করে—শৈশব। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, কে কতদিন শিশু থাকার সুযোগ পাবে।
সচ্ছল পরিবারের দশ বছরের শিশু কোনো আয় না করলেও আমাদের কাছে তা অস্বাভাবিক নয়। বরং তাকে আয় করতে হলে আমরা উদ্বিগ্ন হব। কারণ তার সময়ের মূল্য আমরা আজকের টাকায় হিসাব করি না। সে এখন খেলবে, পড়বে, ঘুমাবে, আঁকবে, ফুটবল খেলবে, বন্ধুর বাসায় যাবে, হয়তো কিছুই করবে না। এই “কিছু না করা”-ও তার শৈশবের বৈধ অংশ। কারণ তার সময়কে আমরা ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখি।
কিন্তু দরিদ্র শিশুর সময় খুব তাড়াতাড়ি বর্তমানের অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠতে পারে। তার কয়েক ঘণ্টা দোকানে থাকা মানে কিছু টাকা। গ্যারেজে থাকা মানে কিছু টাকা। অন্যের সন্তান দেখাশোনা করা মানে কিছু টাকা। স্কুলে থাকা মানে কখনো কখনো সেই সম্ভাব্য আয়টি না পাওয়া।
বাংলাদেশের ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey-এ ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ child labour-এর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু জাতীয় গড়ের নিচে শ্রেণিগত ব্যবধানটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ: দরিদ্রতম household-এর শিশুদের মধ্যে হার প্রায় ১৪ শতাংশ, ধনীতম household-এ প্রায় ৩ শতাংশ। সরল অনুপাতে দরিদ্রতম গোষ্ঠীতে child labour-এর হার ধনীতম গোষ্ঠীর প্রায় পাঁচ গুণ। স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রেও হার স্কুলে থাকা শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি।
সংখ্যাটি শুধু শিশুশ্রমের সংখ্যা নয়।
এটি আমাদের বলে—
শ্রেণি শুধু ভবিষ্যৎ ভাগ করে না; শৈশবের দৈর্ঘ্যও ভাগ করে।
এই অবস্থাটিকে আমি এই লেখায় বলছি—খরচযোগ্য শৈশব।
শিশুটি খরচযোগ্য নয়। তার জীবনও নয়। কিন্তু একটি সমাজ তার শৈশবকে খরচযোগ্য করে তুলতে পারে।
তার সময় এখনই ব্যবহার করা যায়। তার শ্রম এখনই কেনা যায়। তার স্কুল বাদ পড়তে পারে। তার খেলাধুলা বাতিল করা যায়। তার ঘুম কমানো যায়। তার নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা যায়। তার ভবিষ্যতের একটি অংশ বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে আগেই তুলে নেওয়া যায়।
একটি শিশুর শৈশব আমরা ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখি।
অন্যটির শৈশব আজই ভাঙিয়ে ফেলি।
কারও শৈশব বিনিয়োগ।
কারও শৈশব কাঁচামাল।
এখানে অভিযোগটি দরিদ্র মা-বাবার বিরুদ্ধে নয়। দারিদ্র্যকে নৈতিক ব্যর্থতা বানানো খুব সহজ। “বাবা-মা কেন কাজে পাঠায়?”—এই প্রশ্নটিও সহজ।
কঠিন প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
কেমন সমাজে একটি পরিবারের টিকে থাকার হিসাবের মধ্যে শিশুর সময়কেও আয় হিসেবে ধরতে হয়?
অর্থাৎ শিশুশ্রমের প্রশ্ন শুধু parenting-এর নয়। এটি মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, শিক্ষা, ঋণ, কর্মসংস্থান এবং অসমতার প্রশ্নও।
বাংলাদেশের শিশু আইন ১৮ বছরের নিচের মানুষকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শ্রম আইনের কাঠামোয়ও শিশু ও কিশোর শ্রমের ক্ষেত্রে বয়সের সীমা রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ শিশুর বিশ্রাম, খেলা, শিক্ষা, বিকাশ এবং শোষণ থেকে সুরক্ষার অধিকার স্বীকার করে।
কিন্তু আইন কাকে শিশু বলছে, সেটিই শেষ কথা নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—
আমাদের দৈনন্দিন সমাজ কাকে শিশু হিসেবে আচরণ করছে?
“শিশু” শুধু একটি বয়স নয়। শিশু একটি সামাজিক মর্যাদা।
শিশু হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার অর্থ—তোমাকে সবসময় উৎপাদনশীল হতে হবে না। তোমার আয় না করেও বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তোমার খেলা সময়ের অপচয় নয়। তোমার ঘুম অলসতা নয়। তোমার ভুল করার সুযোগ আছে। তোমার শরীর অন্যের ব্যবহারের জন্য নয়। তোমার বর্তমানকে বর্তমানের শ্রমবাজারে বন্ধক দেওয়া যাবে না।
সমস্যা হলো, এই সামাজিক মর্যাদাটি সব শিশুর জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়।
একটি মোটর গ্যারেজ ভাবুন।
একটি গাড়ি উঁচু করা আছে। গাড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে আছে দুটি ছোট পা। শিশুটি হয়তো যন্ত্রপাতি ধরিয়ে দিচ্ছে। তার শরীরে তেল। হাতে ধাতুর দাগ। বড়দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে শিখছে কাজ।
আমরা হয়তো তার দক্ষতা দেখে মুগ্ধও হই।
বলতে পারি—
“দেখেছেন, কত smart!”
“ছোট থেকেই কাজ শিখছে।”
“জীবনে দাঁড়িয়ে যাবে।”
কথাগুলো পুরোপুরি মিথ্যাও নয়। শিশুটি সত্যিই দক্ষ হতে পারে। সত্যিই শিখতে পারে। সত্যিই তার agency থাকতে পারে।
কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন না করলে ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
দশ বছরের একটি শিশুকে এত দক্ষ হয়ে উঠতে হলো কেন?
আমাদের সন্তানের দশ বছর বয়সে self-reliance মানে নিজের স্কুলব্যাগ গুছিয়ে রাখা। অন্য শিশুর self-reliance মানে নিজের খাবারের টাকা জোগাড় করা।
দুটোকেই “স্বাবলম্বিতা” বললে শব্দটি বাস্তবতার পার্থক্য মুছে দেয়।
বেঁচে থাকার দক্ষতা আর স্বাধীনতা এক জিনিস নয়।
একটি শিশু বিপদ চিনতে শিখেছে—এটি তার বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু এত অল্প বয়সে তাকে বিপদ চিনে বেঁচে থাকতে হচ্ছে—এটি সমাজের সাফল্য নয়।
শিশুশ্রম নিয়ে আলোচনা সাধারণত এখানে এসে থেমে যায়—শিশুটি কাজ করছে, কত ঘণ্টা করছে, স্কুলে যাচ্ছে কি না।
কিন্তু আরও কিছু প্রশ্ন আছে।
কোথায় কাজ করছে?
কার সঙ্গে?
কার অধীনে?
কোথায় ঘুমায়?
কাজ ছেড়ে চলে যেতে পারে?
Employer-এর সঙ্গে দ্বিমত করতে পারে?
কেউ মারলে কাকে বলবে?
কেউ তার শরীর স্পর্শ করলে কাকে বলবে?
অভিযোগ করলে কে বিশ্বাস করবে?
চাকরি হারালে কোথায় যাবে?
এগুলো শ্রমের বাইরের প্রশ্ন মনে হতে পারে। আসলে এগুলোই শ্রম, শরীর এবং ক্ষমতার সংযোগস্থল।
শিশুর শরীরের চারপাশে অদৃশ্য কিছু সুরক্ষাবলয় থাকে—পরিবার, নিরাপদ ঘর, স্কুল, বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক, নিরাপদ ঘুমানোর জায়গা, চিকিৎসা, অভিযোগের পথ, বিকল্প আশ্রয়, আইনি সহায়তা।
কোনো শিশুর চারপাশে এই দেয়ালগুলো ঘন।
কোনো শিশুর চারপাশে খুব পাতলা।
কারও প্রায় নেই।
যৌন নির্যাতনের কথা উঠলেই আমরা সাধারণত একজন অপরাধী খুঁজি। একজন খারাপ মানুষ। একজন predator। এবং অপরাধীর দায় অবশ্যই অপরাধীর।
কিন্তু শুধু “খারাপ লোক” দিয়ে গল্প শেষ করলে একটি বড় প্রশ্ন বাদ পড়ে যায়।
কেন কিছু শিশুর শরীর অপরাধীর নাগালের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সহজে চলে আসে?
ধরা যাক, শিশুটি অন্যের বাসায় থাকে। খাবারও সেখানেই। ঘুমও সেখানেই। বেতনও সেখান থেকে। বাড়ি ফিরে যাওয়ার টাকা তার হাতে নেই। অভিযোগ করলে কাজ যাবে। কাজ গেলে হয়তো পরিবারের আয় কমবে। তার নিজের ফোন নেই। থানায় নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। বিকল্প বাসস্থান নেই।
এই অবস্থাগুলোর কোনোটিই যৌন নির্যাতন ঘটায় না।
এখানে একটি distinction অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দারিদ্র্য ধর্ষক নয়।
দরিদ্রতা যৌন সহিংসতার সরল কারণও নয়।
কিন্তু দারিদ্র্যের রাজনৈতিক অর্থনীতি একটি শিশুর exposure বাড়াতে পারে, তার dependence বাড়াতে পারে এবং বিপদ থেকে exit-এর খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে।
আমি এটিকেই বলছি—অরক্ষিত শরীরের রাজনৈতিক অর্থনীতি।
প্রশ্ন তাই শুধু—
“কে শিশুটিকে নির্যাতন করল?”
নয়।
প্রশ্ন আরও—
“কোন সামাজিক ব্যবস্থা শিশুটিকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছিল, যেখানে তার শরীরের চারপাশে এত কম সুরক্ষা ছিল?”
এবার রাতের কথা ভাবুন।
আমাদের সন্তানের রাতের নিরাপত্তা খুব সাধারণ কিছু জিনিসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—একটি ঘর, একটি বিছানা, একটি দরজা, দরজায় একটি ছিটকিনি, ঘরের পাশেই পরিচিত মানুষ।
এগুলো এত সাধারণ যে আমরা এগুলোকে privilege বলেও ভাবি না।
কিন্তু Bangladesh Bureau of Statistics-এর Survey on Street Children 2022, UNICEF-এর সহায়তায়, street situation-এ থাকা হাজারো শিশুর অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করে দেখিয়েছে—বড় একটি অংশ public বা open space-এ থাকে ও ঘুমায়। অনেকের শরীর এবং মাটির মাঝখানে থাকে শুধু পাটের বস্তা, কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক বা পাতলা কম্বল। কেউ একা ঘুমায়, কেউ জোড়ায় বা দলে ঘুমিয়ে নিরাপত্তা খোঁজে। শিশুদের রিপোর্ট করা সহিংসতার উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটেছে রাতের ঘুমের সময়।
এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহটি হয়তো কোনো শতাংশ নয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্যটি হতে পারে—
একটি শিশুর নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করার মতো একটি দরজাও নেই।
এক শিশুকে রক্ষা করতে আমরা দরজা বন্ধ করি।
অন্য শিশুকে নিরাপদ থাকতে আরেকটি শিশুর পাশে গা ঘেঁষে ঘুমাতে হয়।
তাই রাতও শ্রেণিনিরপেক্ষ নয়।
মধ্যবিত্ত শিশুর কাছে রাত একটি সময়।
অরক্ষিত শিশুর কাছে রাত একটি ঝুঁকির ভূগোল।
আমাদের ভাষার ভেতরেও শ্রেণি কাজ করে।
একটি বারো বছরের শিশুকে ভাবুন।
তার নিজের মা তাকে ডাকেন—“আমার মেয়ে।”
আমাদের বাসায় কাজ করতে এলে আমরা বলি—
“কাজের মেয়ে।”
দুটি শব্দ।
কিন্তু এই দুটি শব্দে একটি বড় রূপান্তর ঘটে।
তার বয়স পেছনে চলে যায়।
তার childhood পেছনে যায়।
তার function সামনে আসে।
সে প্রথমত আর শিশু নয়।
সে কাজের মানুষ।
একটি service।
তার পরিচয়ের সঙ্গে কাজ এমনভাবে জুড়ে যায় যে তার শিশুত্ব প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়ে।
Domestic work-এর আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে: এটি ঘটে private household-এর ভেতরে। বাইরের চোখ কম। কাজের শর্ত অনেক সময় আনুষ্ঠানিকভাবে দৃশ্যমান নয়। ILO দীর্ঘদিন ধরে child domestic labour-এর ক্ষেত্রে এই অদৃশ্যতা ও exploitation-এর ঝুঁকির দিকে দৃষ্টি দিয়ে এসেছে।
আমরা সাধারণত privacy-কে নিরাপত্তা হিসেবে দেখি।
কিন্তু একটি employed শিশুর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি উল্টোও হতে পারে।
ঘরের privacy কার?
শিশুটির?
নাকি যে প্রাপ্তবয়স্ক তার ওপর কর্তৃত্ব করছে তার?
কখনও কখনও—
বড়দের privacy-ই শিশুর invisibility হয়ে ওঠে।
এই জায়গায় একটি কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা জরুরি।
শিশুশ্রম মানেই যৌন নির্যাতন নয়।
সব শ্রমজীবী শিশু sexual violence-এর শিকার নয়।
সব street-connected শিশু নির্যাতিত নয়।
সব দরিদ্র শিশুও অসুরক্ষিত নয়।
এবং ধনী পরিবারের শিশুরাও যৌন সহিংসতার শিকার হতে পারে।
অতএব এই লেখার যুক্তি কোনো যান্ত্রিক সমীকরণ নয়—
poverty = abuse
না।
যুক্তিটি হলো—শ্রেণি নির্ধারণ করতে পারে না কে নির্যাতনের শিকার হবে। কিন্তু শ্রেণি প্রভাবিত করতে পারে কে কতখানি exposed, কার ওপর কার ক্ষমতা, কে কাজ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে, কে অভিযোগ করলে আয় হারাবে, কার জন্য বিকল্প আশ্রয় আছে, কার জন্য আইনজীবী আছে, কার কথা দ্রুত শোনা হবে।
অর্থাৎ এটি causation-এর argument নয়; এটি structural exposure-এর argument।
এই পার্থক্য না রাখলে আমরা দরিদ্রতাকেই অপরাধী বানিয়ে ফেলব। আর তখন যেসব প্রতিষ্ঠান, শ্রমসম্পর্ক, housing arrangement এবং power relation শিশুকে অরক্ষিত করে—সেগুলো আড়ালে চলে যাবে।
এখন শিরোনামের প্রশ্নে ফিরে আসি।
গরিবের বাচ্চার শরীরের দাম কত?
প্রশ্নটি নিষ্ঠুর।
ইচ্ছাকৃতভাবেই।
কারণ কোনো শিশুর শরীরের দাম হতে পারে না।
আইনেও নয়।
নৈতিকভাবেও নয়।
কিন্তু বাস্তব সমাজে protection-এর একটি অর্থনীতি আছে।
একটি শিশু নির্যাতনের শিকার হলে তার প্রয়োজন হতে পারে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, স্কুল বদল, যাতায়াত, মামলা চালিয়ে যাওয়ার সময়, প্রশাসনের কাছে পৌঁছানোর সামর্থ্য, কাজ বা আয় হারালেও কিছুদিন বেঁচে থাকার সক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্ক।
এসবের অনেক কিছুই resource-এর সঙ্গে যুক্ত।
তাহলে হয়তো প্রশ্নটি একটু বদলাতে হবে।
গরিব শিশুর শরীরের দাম কি কম?
নাকি—
তার শরীরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক শক্তি তার চারপাশে কম?
আইনের সামনে শরীরের মর্যাদা সমান।
কিন্তু বিপদে পড়লে সুরক্ষা mobilise করার ক্ষমতা?
সেটিও কি সমান?
ধরা যাক শিশুটি বলে—
“আমাকে মেরেছে।”
“আমাকে ছুঁয়েছে।”
“আমি সেখানে যেতে চাই না।”
তার বিপরীতে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বলেন—
“ও মিথ্যা বলছে।”
“ও চুরি করেছে।”
“ওকে শাসন করেছি মাত্র।”
“ওর চরিত্র খারাপ।”
এবার দুজনের সামাজিক অবস্থান ভাবুন।
একদিকে একটি দরিদ্র শিশু।
অন্যদিকে employer, প্রতিষ্ঠানের প্রধান, স্থানীয় ক্ষমতাবান, শিক্ষক অথবা এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক যার ভাষার পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে।
শিশুটি কি কথা বলতে পারে?
অবশ্যই।
সমস্যা সবসময় তার কণ্ঠনালিতে নয়।
সমস্যা হতে পারে আমাদের কানে।
ক্ষমতা শুধু কে কথা বলতে পারে তা নির্ধারণ করে না; কার কথা বিশ্বাসযোগ্য বলে গণ্য হবে, সেটিও প্রভাবিত করে।
তাই দরিদ্র শিশুকে নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি—
সে কথা বলতে পারে; কিন্তু তার কথা কতদূর যায়?
সহিংসতার সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত সবসময় সেটি নয়, যখন সমাজ সহিংসতাকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে।
আরও ভয়ংকর মুহূর্ত আসে যখন সহিংসতা আমাদের বিস্মিত করা বন্ধ করে দেয়।
একটি ছোট শিশুকে দোকানে কাজ করতে দেখি।
চলে যাই।
গ্যারেজে গাড়ির নিচে দেখি।
চলে যাই।
রাতে ফুটপাতে ঘুমাতে দেখি।
চলে যাই।
অল্পবয়সী গৃহকর্মীকে গভীর রাতেও কাজ করতে দেখি।
হয়তো প্রশ্নই আসে না।
কারণ আমাদের মনের ভেতরে একটি শ্রেণিগত বাক্য তৈরি হয়ে গেছে—
“ওদের জীবনই এমন।”
এই “এমন”-এর মধ্যে বিপদ আছে।
কারণ এরপর নির্দিষ্ট এক শ্রেণির শিশুর কষ্ট আর exceptional থাকে না।
Expected হয়ে যায়।
স্বাভাবিক হয়ে যায়।
তারপর সবচেয়ে নির্মম বাক্যটি বলা সম্ভব হয়—
“গরিবের বাচ্চা, এসব তো হয়।”
ঠিক এই জায়গাতেই violence-এর normalisation ঘটে।
যখন একটি শ্রেণির শিশুর suffering আমাদের আর অবাক করে না, তখন আমরা শুধু সহিংসতার দর্শক থাকি না; আমরা এমন একটি নৈতিক পরিবেশ তৈরি করি যেখানে সেই সহিংসতা জায়গা পায়।
তারপর আমরা বলি—
ওর ভাগ্য খারাপ।
ওদের জীবন এমনই।
ওরা গরিব।
কিন্তু এই “নিয়তি” তৈরি হয় কী দিয়ে?
নিরাপদ housing না থাকা।
পরিবারের স্থিতিশীল আয় না থাকা।
কার্যকর সামাজিক সুরক্ষার ঘাটতি।
স্কুল ছেড়ে যাওয়া।
বিকল্প আশ্রয়ের অভাব।
অভিযোগের কঠিন পথ।
বিচার পেতে সময়, অর্থ ও যোগাযোগ প্রয়োজন হওয়া।
তারপর এই শর্তগুলোর মধ্যে বড় হওয়া একটি শিশুর জীবনে সহিংসতা ঘটলে আমরা সেটিকে ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বলে ফেলি।
“ভাগ্য।”
কিন্তু যে ব্যবস্থাগুলো তাকে অরক্ষিত করেছে, তার বহু কিছুই মানুষের তৈরি।
তাই—
নিয়তি সবসময় প্রকৃতি বানায় না।
অনেক সময় সমাজ এমন পরিস্থিতি বানায়, যা পরে নিয়তির মতো দেখায়।
এখানে আরেকটি বিপদ আছে।
দরিদ্র শিশুর vulnerability নিয়ে লিখতে লিখতে দরিদ্র পরিবারকে caricature বানিয়ে ফেলা।
তা হবে ভুল।
দরিদ্র পরিবারে ভালোবাসা কম—এমন কোনো ভিত্তি নেই। কম সম্পদের মধ্যেও বাবা-মা সন্তানকে রক্ষা করেন। নিজেরা না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ান। আত্মীয়তার network কাজ করে। পাড়া কাজ করে। বন্ধুত্ব কাজ করে। কমিউনিটি কাজ করে।
অন্যদিকে অর্থবান পরিবারও সবসময় নিরাপদ নয়। বড় বাড়ি abuse ঠেকানোর গ্যারান্টি নয়। বন্ধ দরজার ভেতরেও সহিংসতা ঘটতে পারে।
তাই শ্রেণিকে destiny হিসেবে পড়লে আবার সেই একই ভুল হবে।
শ্রেণি victimhood নির্ধারণ করে না।
বরং—
শ্রেণি exposure বদলায়।
শ্রেণি dependence বদলায়।
শ্রেণি exit বদলায়।
শ্রেণি protection mobilise করার ক্ষমতা বদলায়।
শ্রেণি শিশুর ভাগ্য লিখে দেয় না।
কিন্তু শিশুর চারপাশের vulnerability architecture বদলে দিতে পারে।
এবার আবার শুরুতে ফিরে যাই।
দশ বছরের দুজন শিশু।
একজনের সকাল স্কুলের।
বিকেল খেলার।
রাত ঘুমের।
তার সময় আজ কোনো অর্থ উৎপাদন না করলেও সমস্যা নেই।
কারণ তার সময়কে আমরা ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছি।
অন্য শিশুর সময়ের বাজার আছে এখনই।
চা পৌঁছে দিলে মূল্য।
প্লেট ধুলে মূল্য।
দোকানে বসলে মূল্য।
গাড়ির নিচে যন্ত্র ধরলে মূল্য।
অন্যের সন্তান দেখলে মূল্য।
তার সময় ভবিষ্যতের আগে বর্তমানের কাছে দাবি হয়ে এসেছে।
একটির সময় সংরক্ষিত।
অন্যটির সময় ব্যবহারযোগ্য।
এই জায়গাতেই খরচযোগ্য শৈশবের আসল অর্থ।
একটি দেশ কতটা উন্নত, তা মাপার জন্য আমরা GDP দেখি। মাথাপিছু আয় দেখি। সেতু দেখি। মেট্রোরেল দেখি। স্কুলের ফলাফল দেখি। ডিজিটালাইজেশন দেখি।
এসব গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একটি সমাজের নৈতিকতার আরেকটি পরীক্ষা আছে।
সেটি নিজের সন্তানের সামনে হয় না।
নিজের সন্তানকে মানুষ ভালোবাসে—এটি আশ্চর্যের কিছু নয়।
পরীক্ষাটি শুরু হয় অন্যের সন্তানকে সামনে রেখে।
যে আমার রক্তের কেউ নয়।
যে আমার ঘরে থালা ধোয়।
যে আমাকে চা দেয়।
যে আমার গাড়ির চাকা পরিষ্কার করে।
যে ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়ায়।
যে রাতে ফুটপাতে ঘুমায়।
যাকে রক্ষা করলে আমার কোনো ব্যক্তিগত লাভ নেই।
সভ্যতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হলো—সে তার সবচেয়ে ক্ষমতাহীন শিশুটির শরীর, সময় এবং শৈশবকে কতটা রক্ষা করতে পারে।
আর যদি নিজের সন্তানের জন্য আমরা বলি—
“এখন তোমার কাজ শুধু বড় হওয়া,”
কিন্তু অন্যের সন্তানের জন্য বলি—
“এত বড় হয়েছ, কাজ করতে পারো না?”—
তাহলে আমাদের সমস্যাটি শুধু দারিদ্র্য নয়।
শুধু শিশুশ্রমও নয়।
এর চেয়ে গভীর কিছু।
সমস্যাটি আমাদের শৈশবের শ্রেণিব্যবস্থা।
আমরা সব শিশুকে সমানভাবে শিশু মনে করি না।
কারও শৈশব ভবিষ্যতের জন্য আগলে রাখি।
কারও শৈশব বর্তমানেই খরচ করে ফেলি।
আর সম্ভবত এই জায়গা থেকেই শিরোনামের নিষ্ঠুর প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া শুরু হয়—
গরিবের বাচ্চার শরীরের দাম কম নয়।
আমাদের সমাজ তার শরীর, সময় এবং শৈশব রক্ষার পেছনে যে মূল্য দিতে প্রস্তুত—সেটিই কম।
কিন্তু এই অরক্ষিত শিশুটি যদি ছেলে হয়?
তখন শ্রেণির সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি নীরবতা—পুরুষত্ব।
যে সমাজ ছেলেকে ছোটবেলা থেকে শেখায়, “ছেলে মানুষ কাঁদে না”, সেই সমাজ কি সহজে স্বীকার করতে পারে যে একটি ছেলের শরীরও আক্রান্ত হতে পারে?
পরের পর্ব: “ছেলে মানুষ ধর্ষিত হয় না?”
তথ্যসূত্র
Bangladesh Bureau of Statistics & UNICEF, Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey 2025।
Bangladesh Bureau of Statistics, Survey on Street Children 2022।
Government of Bangladesh, শিশু আইন, ২০১৩।
International Labour Organization-এর Bangladesh child labour ও child domestic labour বিষয়ক গবেষণা।
UNICEF Bangladesh-এর child protection ও children living in street situations বিষয়ক প্রতিবেদন।