আমরা শিশু জন্ম দিই, তারপর তাদের দখল করি (শিশুর বিরুদ্ধে সমাজ | পর্ব ২)
বাসায় অতিথি এসেছেন। শিশুটি মায়ের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।
“যাও, মামাকে একটা চুমু দাও।”
শিশুটি যায় না।
“যাও না, মামা কত আদর করে!”
এবারও মাথা নাড়ে।
ঘরের কেউ হেসে বলেন, “কী অসভ্য হয়ে গেছে!”
খুব সাধারণ দৃশ্য। আমাদের অনেকেরই পরিচিত। এখানে কেউ শিশুটিকে মারছে না। কেউ তাকে ঘৃণাও করছে না। বরং চারপাশে তার আপন মানুষ, যারা তাকে ভালোবাসে।
তবু এই ছোট দৃশ্যটির মধ্যে বড় একটি প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
নিজের শরীর নিয়ে শিশুটির ‘না’ বলার অধিকার কোথায়?
আমরা শিশুদের শেখাই—কেউ খারাপভাবে ছুঁতে চাইলে ‘না’ বলবে। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যাবে না। বিপদ মনে হলে চিৎকার করবে। অথচ সেই শিশুই যখন পরিচিত কোনো মানুষের কোলে যেতে চায় না, চুমু দিতে চায় না, জড়িয়ে ধরতে চায় না, তখন তার ‘না’টাকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিই?
আমরা কি সত্যিই শিশুদের ‘না’ বলতে শেখাই?
নাকি শেখাই—‘না’ বলতে পারো, যতক্ষণ তোমার ‘না’ বড়দের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাচ্ছে না?
বাংলাদেশে শিশুকে নিয়ে আমাদের সমস্যার একটি বড় অংশ এখানেই।
সমস্যা এই নয় যে আমরা শিশুদের ভালোবাসি না।
আমরা খুব ভালোবাসি।
সন্তানের অসুখ হলে রাত জাগি। নিজের প্রয়োজন কমিয়ে তার স্কুলের বেতন দিই। নিজের না-পাওয়া সুযোগগুলো তাকে দিতে চাই। ভালো স্কুল, ভালো ফল, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়, নিরাপদ ভবিষ্যৎ—এসবের জন্য বাবা-মা কত পরিশ্রম করেন, তার হিসাব নেই।
আমাদের সমস্যা বরং আরও জটিল।
আমরা শিশু চাই। কিন্তু শিশুর নিজের একটি শৈশব থাকবে—এ কথাটি সবসময় মানতে পারি না।
শিশুটিকে আমরা ভালোবাসি। কিন্তু তার শরীর, সময়, পছন্দ, অপছন্দ, ভয়, গোপনীয়তা, প্রশ্ন, এমনকি তার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের দাবি এত বেশি যে একসময় শিশুটি নিজেই যেন নিজের জীবনের ছোট একজন অংশীদার হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে “ভালো শিশু” বলতে আমরা সাধারণত কাকে বুঝি?
যে বড়দের কথা শোনে।
যে বেশি তর্ক করে না।
অতিথির সামনে শান্ত থাকে।
একবার বললে কাজ করে।
পড়াশোনায় মনোযোগী।
বড়দের মুখের ওপর কথা বলে না।
এমন কিছু করে না যাতে বাবা-মাকে অন্যের সামনে বিব্রত হতে হয়।
এই “ভালো শিশুর” ছবির মধ্যে একটি শব্দ খুব শক্তিশালী—বাধ্য।
শিশুকে অবশ্যই নিয়ম শিখতে হবে। অন্য মানুষকে সম্মান করতে শিখতে হবে। কোন কাজ বিপজ্জনক, কোন আচরণ অন্যের ক্ষতি করে—এসব শেখানো বড়দের দায়িত্ব। পাঁচ বছরের একটি শিশু এবং পনেরো বছরের একজন কিশোরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও এক নয়।
সমস্যা সেখানে নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন আমরা ভালো হওয়া আর বাধ্য হওয়াকে একই জিনিস মনে করি।
প্রশ্ন করলে—বেয়াদব।
যুক্তি দিলে—মুখে মুখে কথা বলে।
“আমি যেতে চাই না” বললে—জেদি।
কাঁদলে—দুর্বল।
একা থাকতে চাইলে—কী হয়েছে তোমার?
নিজের পছন্দ জানালে—বেশি বুঝতে শিখেছে।
তখন শিশুটি খুব দ্রুত একটি শিক্ষা পেয়ে যায়: ভালো হওয়ার অর্থ হলো বড়দের সন্তুষ্ট রাখা।
ফলে নিজের অস্বস্তি চেপে রাখা সে শিখে যায়। নিজের ভয়কে ছোট করে দেখতে শেখে। ‘না’ বলার আগে চারপাশের মুখ দেখতে শেখে।
আমাদের আরেকটি খুব পরিচিত বাক্য আছে—
“বাচ্চাটাকে মানুষ করতে হবে।”
আমরা কথাটি ভালো অর্থেই বলি। কিন্তু একবার উল্টো করে ভাবুন।
বাচ্চাটিকে যদি মানুষ করতে হয়, তাহলে সে এখন কী?
এই ছোট বাক্যের মধ্যে শিশু সম্পর্কে আমাদের গভীর একটি ধারণা লুকিয়ে আছে। শিশু যেন এখনো পুরো মানুষ নয়। সে ভবিষ্যতের মানুষ। এখন সে কাঁচামাল—তাকে গড়তে হবে, ঠিক করতে হবে, শাসন করতে হবে, সঠিক পথে নিতে হবে।
তাই শিশুর বর্তমানের চেয়ে তার ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
“বড় হয়ে কী হবে?”
“কোন স্কুলে পড়বে?”
“কোন বিষয় নেবে?”
“ডাক্তার হবে, ইঞ্জিনিয়ার হবে?”
“ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকবে তো?”
“জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে তো?”
এসব প্রশ্ন আমরা অনায়াসে করি।
কিন্তু প্রশ্ন করি কম—
সে এখন কেমন আছে?
আজ তার মন ভালো আছে কি?
আজ সে ভয় পেয়েছে কি?
আজ সে ক্লান্ত কি?
আজ তার কোনো কথা আছে কি?
আজ তার একটু কিছু না করে থাকার ইচ্ছা আছে কি?
আজ সে সুখী কি?
আমরা শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে এত ব্যস্ত যে কখনো কখনো তার বর্তমান জীবনটাই আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।
ঢাকার একটি পরিচিত সকাল কল্পনা করুন।
ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। স্কুল। যানজট পেরিয়ে বাসায় ফেরা। খাওয়া শেষ হতে না হতেই কোচিং বা টিউটর। তারপর হোমওয়ার্ক। কারও ধর্মীয় শিক্ষা আছে। কারও গান। কারও drawing। কারও swimming। কারও coding।
সবকিছুরই একটি কারণ আছে।
ইংরেজি শিখলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
coding শিখলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।
গান শিখলেও certificate পাওয়া যাবে।
খেলাধুলাও fitness-এর জন্য।
বই পড়লেও vocabulary বাড়তে হবে।
শিশুটির জীবনের প্রতিটি ঘণ্টাকে যেন ভবিষ্যতের জন্য কাজে লাগাতে হবে।
কিন্তু সে কি এমন কিছু করতে পারে যার কোনো উদ্দেশ্য নেই?
বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখা?
মাটিতে বসে পিঁপড়া দেখা?
বন্ধুর সঙ্গে অর্থহীন গল্প করা?
কাগজ কেটে কিছু বানানো?
মাঠে নেমে এমনভাবে খেলা, যেখানে কোনো coach নেই?
বিছানায় শুয়ে কিছু না করা?
বড়দের ভাষায়—“সময় নষ্ট করা”?
আমরা বড়রা productivity-র যে পৃথিবী তৈরি করেছি, সেই পৃথিবী ক্রমে শিশুদের ঘরেও ঢুকে পড়েছে।
শিশুর অবসরও এখন productive হতে হবে।
অথচ খেলা কোনো পুরস্কার নয়।
“ভালো ফল করলে খেলতে দেব”—এই বাক্যটির ভেতরেই সমস্যাটি আছে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ শিশুর বিশ্রাম, অবসর ও খেলাকে অধিকার হিসেবে স্বীকার করেছে। একই সনদ শিশুর নিজের মত প্রকাশ এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারও স্বীকার করে। অর্থাৎ খেলা, মতামত কিংবা privacy বড়দের দয়া নয়; এগুলো শিশুকে পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখার অংশ।
আমরা শিশুর প্রতিটি ঘণ্টাকে ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করতে গিয়ে তার বর্তমানটিই কেড়ে নিচ্ছি কি না—এই প্রশ্ন তাই করা দরকার।
কারণ আট বছর বয়স একবারই আসে।
বারো বছরের একটি বিকেল পরে কোনো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে ফেরত দেওয়া যায় না।
শৈশব ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতিকক্ষ নয়।
শৈশব নিজেই জীবন।
শুধু সময় নয়। শিশুর নিজের শরীরের ওপর তার অধিকারও এখান থেকে দেখতে হবে।
“মামাকে সালাম করো।”
“খালাকে চুমু দাও।”
“কোলে যাও।”
“এত লজ্জা কিসের?”
এসবের পেছনে অধিকাংশ সময় কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। এগুলো আমাদের আত্মীয়তা, আদর, ভদ্রতার পরিচিত ভাষা।
কিন্তু শিশুটি যদি না চায়?
তখন কি তার অস্বস্তি আমাদের কাছে যথেষ্ট কারণ?
আমরা বড় হয়ে তাকে consent শেখাতে চাই। বলি, নিজের শরীরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তোমার।
কিন্তু সেই শিক্ষা কৈশোরে হঠাৎ শুরু হয় না।
এটি শুরু হয় খুব ছোট জায়গা থেকে।
কেউ কোলে নিতে চাইছে, সে যেতে চাইছে না।
কেউ চুমু চাইছে, সে দিতে চাইছে না।
কেউ আদর করছে, তার অস্বস্তি লাগছে।
সেখানে বড়রা কী করেন, সেটাই প্রথম শিক্ষা।
“তোমার শরীর তোমার”—এই কথাটি মুখে শেখানোর আগে আচরণে শেখাতে হয়।
শিশুর ‘না’কে যদি আমরা প্রতিদিন উপেক্ষা করি, পরে বিপদের সময় শক্ত করে ‘না’ বলতে বলাটা একটি অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তৈরি করে।
শুধু শরীর কেন?
শিশুটি বলল—
“ওই মানুষটাকে আমার ভালো লাগে না।”
“আমি ওখানে যেতে চাই না।”
“আমি ভয় পাচ্ছি।”
“আমি এখন কথা বলতে চাই না।”
“এই স্কুলটা আমার ভালো লাগছে না।”
আমরা এসব বাক্যকে কীভাবে শুনি?
একটি তথ্য হিসেবে?
নাকি অবাধ্যতা হিসেবে?
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করে এমন বিষয়ে তার মত শোনার অধিকার আছে এবং তার বয়স ও পরিণতিবোধ অনুযায়ী সেই মতকে গুরুত্ব দিতে হবে। এর মানে এই নয় যে ছয় বছরের একটি শিশু সংসারের সব সিদ্ধান্ত নেবে। এর অর্থ আরও সহজ—
ছয় বছরের শিশুটিও মানুষ।
তার ভয়কে ভয় হিসেবে শুনতে হবে।
তার অস্বস্তিকে অস্বস্তি হিসেবে।
তার মতকে মত হিসেবে।
তার ‘না’কে অন্তত এমন একটি কথা হিসেবে, যার উত্তর আমাদের দিতে হবে।
আর এখানেই আমাদের ভালোবাসার আরেকটি চেহারা দেখা যায়।
বাংলাদেশের বাবা-মা সন্তানের জন্য বিপুল ত্যাগ করেন। সেই সত্য স্বীকার করেই কঠিন প্রশ্নটি করা যায়—
আমি কারও ভালো চাই বলেই কি তার জীবনের সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার হয়ে যায়?
আমাদের পরিবারে একটি বাক্য প্রায় সব বিতর্ক শেষ করে দিতে পারে—
“তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
কোথায় পড়বে—তোমার ভালোর জন্য।
কার সঙ্গে মিশবে—তোমার ভালোর জন্য।
কখন বাইরে যাবে—তোমার ভালোর জন্য।
কী পরবে—তোমার ভালোর জন্য।
কী নিয়ে পড়বে—তোমার ভালোর জন্য।
কোন পেশায় যাবে—তোমার ভালোর জন্য।
কখনো কাকে বিয়ে করবে—সেটিও তোমার ভালোর জন্য।
সন্তানের ভালোর কথা ভাবা বাবা-মায়ের দায়িত্ব।
কিন্তু “তোমার ভালোর জন্য” যখন আর কোনো প্রশ্নের সুযোগ রাখে না, তখন ভালোবাসার সঙ্গে আরেকটি জিনিস এসে মেশে—ক্ষমতা।
এটিকে আমরা ভালোবাসার শাসন বলতে পারি।
এই শাসন বলে না, “আমি শক্তিশালী, তাই আমার কথা শুনবে।”
এটি বলে—
“আমি তোমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। তাই তোমার জন্য কোনটা ভালো, আমি তোমার চেয়ে ভালো জানি।”
এ কারণেই এই ক্ষমতাকে দেখা কঠিন।
এর ভাষা আদরের।
এর পেছনে সত্যিকারের ত্যাগ আছে।
এর সঙ্গে ভয় আছে—সন্তান যদি ব্যর্থ হয়?
সমাজ কী বলবে?
ভুল বন্ধু বেছে নিলে?
খারাপ পথে গেলে?
আর কখনো আছে আমাদের নিজেদের অপূর্ণ স্বপ্ন।
আমি যা হতে পারিনি, আমার সন্তান হবে।
আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারিনি, সে পড়বে।
আমি যে সম্মান পাইনি, তার সাফল্যে সেটি ফিরে আসবে।
একসময় সন্তান শুধু সন্তান থাকে না। সে পরিবারের স্বপ্ন, সম্মান, ভয়, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুর বাহক হয়ে ওঠে।
তখন “আমার সন্তান” কথাটির “আমার” অংশটি একটু পরীক্ষা করা দরকার।
এই “আমার” কি শুধু মমতা?
নাকি তার মধ্যে সামান্য মালিকানাও আছে?
তার ফলাফল আমার সম্মান।
তার পোশাক আমার সম্মান।
তার আচরণ আমার সম্মান।
তার পেশা আমার সাফল্য।
তার ব্যর্থতা আমার লজ্জা।
সন্তান যদি আমাদের পরিকল্পনামতো না হয়?
যে বিষয় পড়াতে চাই, সেটি না পড়ে?
আমাদের চেয়ে অন্যভাবে পৃথিবীকে দেখে?
আমাদের সামনে যুক্তি দেয়?
নিজের বন্ধু নিজে বেছে নেয়?
ব্যর্থ হয়?
আমাদের স্বপ্ন পূরণ না করে নিজের স্বপ্নের দিকে যায়?
তখন কি আমাদের ভালোবাসা একই থাকে?
প্রশ্নটি কঠিন। কিন্তু জরুরি।
কারণ ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ সবসময় একে অন্যের বিপরীত নয়। কখনো কখনো ভালোবাসাই নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ভাষা হয়ে ওঠে।
এবার আরেকটি দরজা।
একজন কিশোরীর ঘরের দরজা বন্ধ।
মা দরজা খুলে ঢুকে বললেন, “আমার কাছ থেকে আবার privacy কী?”
অন্য একটি বাড়িতে বাবা সন্তানের ফোন হাতে নিয়ে সব message পড়ছেন।
আরেক পরিবারে সন্তানের ঘুমন্ত ছবি, পরীক্ষার ফল, রাগের ভিডিও, কান্নার ছবি—সব Facebook-এ। শিশুটি বড় হলে সে ছবিগুলো রাখতে চাইবে কি না, আমরা জানি না।
আমরা বড়রা নিজেদের privacy চাই।
নিজের ফোনে password রাখি।
নিজের কথোপকথন অন্যে পড়লে বিরক্ত হই।
নিজের খারাপ ছবি অনুমতি ছাড়া কেউ দিলে রাগ করি।
কিন্তু শিশুর privacy-কে আমরা প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখি।
“আমার সন্তান, আমার কাছে লুকানোর কী আছে?”
অবশ্যই বাবা-মায়ের নজর রাখতে হবে। অনলাইনে শিশুদের বাস্তব ঝুঁকি আছে। প্রতারণা আছে, bullying আছে, যৌন শোষণের ঝুঁকি আছে। বয়স অনুযায়ী supervision দরকার।
কিন্তু দেখাশোনা আর মালিকানা এক নয়।
নিরাপত্তা আর বন্দিত্ব এক নয়।
পথ দেখানো আর তল্লাশি করা এক নয়।
দায়িত্ব আর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এক নয়।
শিশুর অধিকারের কথা বললেই তাই একটি আপত্তি আসে—
“তাহলে কি বাবা-মা কিছুই বলবে না?”
অবশ্যই বলবে।
রাস্তা পার হওয়ার সময় শিশুর হাত ধরতে হবে।
আগুনে হাত দিতে দেওয়া যাবে না।
ঘুমের নিয়ম লাগবে।
screen-এর সীমা লাগবে।
স্কুলে যেতে ইচ্ছা করছে না বললেই স্কুল বন্ধ করা যাবে না।
শিশুর অভিজ্ঞতা কম, ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে বাড়ে। বড়দের দায়িত্ব তাই বাস্তব।
কিন্তু এখানেই পার্থক্যগুলো জরুরি—
দায়িত্ব মানে মালিকানা নয়।
শাসন মানে অপমান নয়।
শৃঙ্খলা মানে সহিংসতা নয়।
নিরাপত্তা মানে স্বাধীনতা মুছে দেওয়া নয়।
পথ দেখানো মানে মুখ বন্ধ করা নয়।
এই পার্থক্য বাংলাদেশে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও UNICEF-এর ২০২৫ সালের জাতীয় MICS জরিপের চূড়ান্ত ফল বলছে, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি অথবা মানসিক আগ্রাসনের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতি দশটি শিশুর মধ্যে সাড়ে আটটিরও বেশি। ২০১৯ সালেও হারটি ছিল ৮৮.৮ শতাংশ।
এ সংখ্যা আমাদের সামনে একটি কঠিন আয়না ধরে।
শিশুকে মারা, ধমকানো, অপমান করা বা ভয় দেখানোকে আমরা এখনও অনেক সময় “শাসন” বলে স্বাভাবিক করে ফেলি।
“আমরাও তো মার খেয়ে বড় হয়েছি।”
কথাটি প্রায়ই শোনা যায়।
কিন্তু কোনো কষ্ট আমরা সহ্য করেছি বলেই সেটি পরের প্রজন্মের জন্য ভালো হয়ে যায় না।
ভয় পেয়ে বাধ্য হওয়া এবং ভালো-মন্দ বুঝে দায়িত্বশীল হওয়া এক জিনিস নয়।
যে শিশুকে আমরা সারাক্ষণ বলি—
“চুপ।”
“তুমি বুঝবে না।”
“বড়দের সামনে কথা বলবে না।”
“আমি তোমার বাবা, আমি জানি।”
সে আঠারো বছর বয়স হলেই হঠাৎ স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে কীভাবে?
নিজের কথা বলা, অন্যের কথা শোনা, যুক্তি দেওয়া, ভুল করা, ‘না’ বলা এবং অন্যের ‘না’ মেনে নেওয়া—এগুলোও শেখার বিষয়।
এমনকি গণতন্ত্রের প্রথম পাঠও হয়তো সংসদে নয়, বাড়িতেই শুরু হয়।
ক্ষমতাবান হয়েও অন্যের কথা শোনা যায় কি না—সেখান থেকে।
কিন্তু এখানেও সব শিশুর অভিজ্ঞতা এক নয়।
একটি মধ্যবিত্ত মেয়েকে বলা হয়—
“বাইরে বিপদ, বেশি বের হয়ো না।”
তার পৃথিবী ছোট করা হয় নিরাপত্তার নামে।
একটি ছেলেকে বলা হয়—
“ছেলে মানুষ হয়ে কাঁদছ কেন?”
তার কান্না, ভয়, দুর্বলতা ছোট করা হয় পুরুষ হওয়ার নামে।
একজনের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করি।
আরেকজনের অনুভূতি।
মেয়েটি শেখে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে।
ছেলেটি শেখে নিজের ভেতরটা লুকিয়ে রাখতে।
দুজনের কাছ থেকেই শৈশবের কিছু অংশ নেওয়া হয়—শুধু পদ্ধতি আলাদা।
কিন্তু শ্রেণী এসে পার্থক্যটিকে আরও নির্মম করে।
একটি সকাল কল্পনা করুন।
একই শহরে কাছাকাছি বয়সের দুই শিশু ঘুম থেকে উঠছে।
একজনকে মা ডাকছেন—
“উঠো, স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।”
অন্যজনকে কেউ বলছে—
“উঠো, দোকানে যেতে হবে।”
একজনের হাতে স্কুলব্যাগ।
অন্যজনের হাতে চায়ের ট্রে।
একজন বাসায় গ্লাস ভাঙলে আমরা বলি, “ও তো বাচ্চা।”
একই বয়সের আরেকজন রেস্তোরাঁয় গ্লাস ভাঙলে ধমক খায়। কখনো তার মজুরি থেকে দাম কাটা হয়।
একজনের ভুল শৈশবের অংশ।
অন্যজনের ভুল শ্রমের ব্যর্থতা।
এখানে এসে আমাদের শিশু-ভাবনার আরেকটি সত্য বেরিয়ে পড়ে।
আমরা শুধু বয়স দেখে ঠিক করি না কে শিশু। শ্রেণীও ঠিক করে দেয়, কার শৈশব থাকবে।
বাংলাদেশের MICS 2025 অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত—২০১৯ সালে এই হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। জরিপে child labour নির্ধারণ করা হয়েছে বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমার বেশি অর্থনৈতিক কাজ বা গৃহস্থালি শ্রমের ভিত্তিতে।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও বড় প্রশ্নটি খুব সহজ—
একই বয়সে একজন কেন শিশু, আরেকজন কেন শ্রমিক?
একজনকে আমরা বলি,
“তুমি ছোট। তোমার কাজ এখন পড়াশোনা।”
আরেকজনকে বলি,
“এত বড় হয়েছ, এখনো কাজ করতে পারো না?”
এই দুই বাক্যের মাঝখানেই বাংলাদেশের শ্রেণীবিভক্ত শৈশব দাঁড়িয়ে আছে।
আর তখন “আমরা শিশু চাই, শৈশব নয়” কথাটির আরেকটি অর্থ বেরিয়ে আসে।
কিছু শিশুর শৈশব আমরা অতিরিক্ত পরিকল্পনা করি।
আর কিছু শিশুর শৈশবের প্রয়োজনই স্বীকার করি না।
একজনকে এত বেশি রক্ষা করি যে তার স্বাধীনতা থাকে না।
আরেকজনকে এত কম রক্ষা করি যে তার শৈশবই থাকে না।
দুজন দুই প্রান্তে।
কিন্তু প্রশ্নটি একই—
শিশুটি কি নিজে একজন মানুষ, নাকি বড়দের প্রয়োজন মেটানোর একটি শরীর?
এই প্রশ্ন আমাদের নিজেদের ঘরেও ফেরত আসে।
আমরা সন্তান চাই।
তার নিরাপত্তা চাই।
ভালো স্কুল চাই।
ভালো ফল চাই।
ভালো বিশ্ববিদ্যালয় চাই।
ভালো চাকরি চাই।
ভালো জীবন চাই।
এসব চাওয়ার মধ্যে কোনো অপরাধ নেই।
কিন্তু তালিকাটির ভেতর প্রায়ই একটি জিনিস হারিয়ে যায়—
তার বর্তমান।
আজ তার বয়স আট।
আট বছর বয়সটি আর আসবে না।
আজ সে খেলতে চায়।
আজ তার মন খারাপ।
আজ সে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করতে চায়।
আজ সে আমাদের সঙ্গে একমত নয়।
আজ সে দরজা বন্ধ করে একটু একা থাকতে চায়।
আজ সে কাউকে চুমু দিতে চায় না।
আজ সে হয়তো শুধু কিছু না করে বসে থাকতে চায়।
এসব ছোট বিষয় নয়।
এই ছোট ছোট জায়গাগুলো দিয়েই শৈশব তৈরি হয়।
শিশুর অধিকার মানে তাকে ছোট আকারের একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ বানানো নয়।
বরং এর শুরু একটি খুব সাধারণ স্বীকৃতি দিয়ে—
সে ছোট। কিন্তু সে ইতোমধ্যেই মানুষ।
তার নিজের শরীর আছে।
নিজের মন আছে।
নিজের ভয় আছে।
নিজের আনন্দ আছে।
নিজের সময় আছে।
এবং ধীরে ধীরে নিজের হয়ে ওঠার অধিকার আছে।
তাই সমস্যাটা হয়তো এই নয় যে আমরা শিশুদের ভালোবাসি না।
আমরা ভালোবাসি।
কখনো জীবন দিয়ে ভালোবাসি।
সমস্যা হলো, কখনো কখনো আমরা তাদের এমনভাবে ভালোবাসি যেন তাদের জীবন আমাদের জীবনেরই সম্প্রসারণ।
আমরা তাদের শরীর রক্ষা করতে চাই, কিন্তু সেই শরীর নিয়ে তাদের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত মেনে নিতে কষ্ট হয়।
তাদের ভবিষ্যতের জন্য যুদ্ধ করি, কিন্তু বর্তমান সময়টুকু নিজেদের পরিকল্পনায় ভরে দিই।
তাদের শক্তিশালী হতে বলি, কিন্তু প্রশ্ন করতে দিলে ভয় পাই।
তাদের নিরাপদ রাখতে চাই, কিন্তু স্বাধীন হওয়ার ছোট ছোট অনুশীলন বন্ধ করে দিই।
আমরা তাদের “মানুষ করতে” চাই।
আর ঠিক সেখানেই কখনো কখনো ভুলে যাই—
তারা ইতোমধ্যেই মানুষ।
তাই শেষ প্রশ্নটি “আমরা শিশুদের ভালোবাসি কি না”—এটি নয়।
প্রশ্নটি আরও কঠিন।
আমরা কি এমন একটি শিশুকে ভালোবাসতে পারি, যার নিজের মত আছে?
যে ‘না’ বলতে পারে?
যে আমাদের হতাশ করতে পারে?
যে আমাদের মতো হবে না?
যে আমাদের স্বপ্নের বদলে নিজের স্বপ্ন বেছে নিতে পারে?
যে বড় হতে হতে একদিন সত্যিই আমাদের থেকে আলাদা একজন মানুষ হয়ে উঠবে?
কারণ শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর এবং বড়দের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি এটাই—
একটি শিশু আমাদের কাছ থেকে আসে, কিন্তু আমাদের মালিকানায় থাকার জন্য আসে না।
সে ধীরে ধীরে নিজের হয়ে ওঠে।
আর সম্ভবত এখানেই আমাদের সমাজের গভীর দ্বিধা।
আমরা শিশু চাই।
কিন্তু শৈশবের সবচেয়ে বিপজ্জনক সৌন্দর্যটি—একজন মানুষের ধীরে ধীরে নিজের হয়ে ওঠা—আমরা সবসময় চাই না।