| | |

কাউকে হত্যাযোগ্য করে তোলা যাবে না

রাষ্ট্রীয় ক্রসফায়ার থেকে ডিজিটাল মব ইন্ডাস্ট্রি

বাংলাদেশে এখন এক ধরনের আপৎকাল চলছে। বন্যাদুর্গত মানুষ ঘর হারাচ্ছে, আশ্রয় ও খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এমন সময়ে আমাদের কথা বলার কথা ছিল উদ্ধার, পুনর্বাসন ও নাগরিক সংহতি নিয়ে। অথচ এসবের মধ্যেও সামাজিক হত্যা নিয়ে লিখতে হচ্ছে। কারণ দুর্যোগের পাশাপাশি দেশে আরেকটি ভয়ংকর প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়ে উঠেছে—প্রকাশ্যে কোন মানুষকে ঘিরে ঘৃণা তৈরি করা, তাকে সামাজিকভাবে একা করা এবং শেষ পর্যন্ত আক্রমণযোগ্য, এমনকি হত্যাযোগ্য হিসেবে হাজির করা।

একজন মানুষকে শারীরিকভাবে হত্যার আগে প্রায়ই তার সামাজিক পরিচয় হত্যা করা হয়। তার নামের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয় একটি অভিযোগ—চোর, দালাল, ধর্মদ্রোহী, অপরাধী, স্বৈরাচারের সহযোগী কিংবা দেশবিরোধী। অভিযোগটি প্রমাণিত কি না, সেটি ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, মানুষটিকে ঘৃণা করা যাচ্ছে কি না, তার পক্ষে কথা বলাকে সন্দেহজনক করা যাচ্ছে কি না এবং তাকে আঘাত করার পর সমাজকে নীরব রাখা যাচ্ছে কি না।

এটিই সামাজিক হত্যা। আর যখন অভিযোগ তৈরি, ডিজিটাল প্রচার, মানুষ জড়ো করা, আক্রমণ, ভিডিও ছড়ানো, রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং পরে দায় অস্বীকার—সবকিছু একটি পুনরাবৃত্ত ব্যবস্থায় পরিণত হয়, তখন তা আর বিচ্ছিন্ন মব নয়। সেটি হয়ে ওঠে মব ইন্ডাস্ট্রি

রাষ্ট্রই প্রথমে এই ভাষা শিখিয়েছে

মব ইন্ডাস্ট্রি শূন্য থেকে জন্ম নেয়নি। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন সমাজকে বিচারহীন শাস্তির একটি ভাষা শিখিয়েছে।

কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম এবং মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কাউকে প্রথমে অপরাধী ঘোষণা করা হতো; পরে তার মৃত্যুর পক্ষে একটি প্রস্তুত গল্প হাজির করা হতো। আদালত, প্রমাণ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের আগেই মানুষটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যেন তার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন নেই।

এই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সমাজকে কয়েকটি ভয়ংকর শিক্ষা দিয়েছে: অভিযোগ প্রমাণের বিকল্প হতে পারে; কিছু মানুষের আইনি অধিকার অন্যদের চেয়ে কম; হত্যার পর একটি গ্রহণযোগ্য গল্প তৈরি করতে পারলে দায় এড়ানো যায়; এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার বদলে তাৎক্ষণিক শাস্তিই অধিক কার্যকর।

জুলাই–আগস্টের রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞ এই বিচারবহির্ভূত সংস্কৃতির সবচেয়ে নির্মম প্রকাশ। মানুষ সেই হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু শাসনের পতনের পরও হত্যাযোগ্য মানুষ তৈরির পুরোনো ব্যাকরণ হারিয়ে যায়নি। রাষ্ট্রীয় বন্দুকের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে; অথচ বিচারবহির্ভূত শাস্তির আকাঙ্ক্ষা বিভিন্ন রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ব্যবসায়িক ও স্থানীয় শক্তির মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

আগে রাষ্ট্র কাউকে শত্রু ঘোষণা করে হত্যা করত। এখন একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্ক কাউকে শত্রু বানিয়ে জনতার সামনে ছেড়ে দিতে পারে।

প্রতিবাদের কৌশল থেকে মবের প্রযুক্তি

জুলাইয়ের গণপ্রতিরোধে জমায়েত, ঘেরাও, আল্টিমেটাম, দ্রুত ডিজিটাল যোগাযোগ এবং সম্মিলিত উপস্থিতি ছিল রাষ্ট্রীয় হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কৌশল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই কৌশলগুলোর একটি অংশ বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করে।

এখন সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ ছড়িয়ে লোকেশন প্রকাশ করা হয়; “ব্যবস্থা নেওয়ার” আহ্বান জানানো হয়; মানুষ জড়ো করা হয়; প্রতিষ্ঠান ঘেরাও করা হয়; কাউকে ধরে আনা কিংবা প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। প্রতিরোধের ভাষা ব্যবহার করে প্রতিশোধ কার্যকর করা হয়।

অর্থাৎ আন্দোলন মবে পরিণত হয়নি; আন্দোলনের কিছু কৌশলকে মবের প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা হয়েছে।

এই রূপান্তরকে সহজ করেছে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনের দ্বিধা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা। যখন রাষ্ট্র শুরুতেই জীবন রক্ষা করে না, তখন মব বুঝে যায়—যথেষ্ট মানুষ জড়ো করা গেলে আইনকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা সম্ভব।

মব ইন্ডাস্ট্রির সরবরাহ-শৃঙ্খল

মব ইন্ডাস্ট্রিতে স্পষ্ট শ্রমবিভাজন থাকে।

একজন অভিযোগ তৈরি করে। আরেকজন তাকে গ্রহণযোগ্য ভাষা দেয়। কেউ স্ক্রিনশট, কাটা ভিডিও বা পুরোনো ছবি ছড়ায়। কেউ মানুষের অবস্থান জানায়। কেউ জমায়েতের আহ্বান করে। কেউ অর্থ, মাইক বা যানবাহন সরবরাহ করে। কেউ প্রথম আঘাতটি করে। কেউ ভিডিও ধারণ করে। কেউ সেটিকে ছড়িয়ে সহিংসতাকে শক্তির প্রদর্শনীতে পরিণত করে। পরে কেউ অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক সুরক্ষা দেয়।

এখানে প্রত্যেকের লাভও আলাদা। কেউ অনুসারী বাড়ায়, কেউ ধর্মীয় বা নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে, কেউ প্রতিপক্ষকে সরায়, কেউ জমি বা ব্যবসা দখল করে, কেউ রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন করে।

এই অর্থেই সামাজিক হত্যা পেশায় পরিণত হয়। প্রত্যেকে সরাসরি অর্থ না পেলেও রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা প্রতীকী মুনাফা পায়।

গণহত্যার স্মৃতি কোনো লাইসেন্স নয়

জুলাই–আগস্টের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি বাংলাদেশের ন্যায়বিচারের দাবিকে শক্তিশালী করার কথা। সেই স্মৃতি ব্যবহার করে আরেকজনকে বিচারহীনভাবে আক্রমণ করার বৈধতা তৈরি করা যায় না।

কেউ অতীতের দমন-পীড়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল—এমন অভিযোগ উঠতেই পারে। সেই অভিযোগের তদন্ত ও বিচার হতে হবে। কিন্তু নিহতদের স্মৃতি, আহতদের শরীর কিংবা গণঅভ্যুত্থানের আবেগ ব্যবহার করে কাউকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।

গণহত্যার স্মৃতি দিয়ে মব ইন্ডাস্ট্রিকে বৈধতা দেওয়া মানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়; একটি বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থার জায়গায় আরেকটি বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা বসানো।

প্রতিশোধ বিচার নয়। একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধকে বৈধ করে না।

কুশীলবকে কেন্দ্র নয়, আইনের আওতায় আনুন

সামাজিক হত্যার কুশীলবদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তাদেরই জনপরিসরের কেন্দ্র বানানো যাবে না। তাদের প্রতিটি উসকানি পুনঃপ্রচার, প্রতিটি ভিডিও ভাইরাল এবং প্রতিটি বক্তব্য নিয়ে দিনের পর দিন আলোচনা করলে তাদের ক্ষমতা ও পরিচিতিই বাড়ে।

তাদের নায়ক, খলনায়ক কিংবা ডিজিটাল সেলিব্রিটি বানানোর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রমাণ সংরক্ষণ এবং আইন প্রয়োগ।

শুধু শেষ আঘাতকারীকে গ্রেপ্তার করলে হবে না। কে অভিযোগ তৈরি করেছে, কে সেটি ছড়িয়েছে, কে মানুষ ডেকেছে, কে অবস্থান জানিয়েছে, কে হামলার ব্যবস্থা করেছে, কে দায়িত্ব থাকার পরও প্রতিরোধ করেনি এবং কে পরে অপরাধীদের রক্ষা করেছে—পুরো সরবরাহ-শৃঙ্খলকে বিচারের আওতায় আনতে হবে।

তবে মব দমনের নামে নতুন ক্রসফায়ার, গুম কিংবা নির্বিচার গ্রেপ্তারের রাষ্ট্রও তৈরি করা যাবে না। মব ইন্ডাস্ট্রির উত্তর আরেকটি বিচারবহির্ভূত ব্যবস্থা নয়। উত্তর হলো দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার।

বাংলাদেশ আজ শুধু বন্যার পানির মধ্যে নয়; বিচারহীনতারও একটি বিপজ্জনক স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। বন্যার পানি ঘর ভাসায়। মব ইন্ডাস্ট্রি ভাসিয়ে নিয়ে যায় আইন, বিবেক ও মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার।

রাষ্ট্রীয় ক্রসফায়ার এবং ডিজিটাল মবের চেহারা আলাদা হলেও তাদের ব্যাকরণ একই: প্রথমে মানুষটিকে হত্যাযোগ্য করে তোলা, পরে তার ওপর সহিংসতা চালানো এবং শেষে তার মৃত্যুর পক্ষে একটি গল্প বানানো।

কাউকে হত্যাযোগ্য করে তোলা যাবে না।

মব ইন্ডাস্ট্রির কুশীলবদের আলোচনার কেন্দ্রে নয়, আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। যে রাষ্ট্র তা করতে ব্যর্থ হয়, সে কেবল মব ঠেকাতে ব্যর্থ হয় না—সে হত্যার পরবর্তী আয়োজনটিও সহজ করে দেয়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *