মেথিকান্দা
মেথিকান্দা | ববি বেগমের স্মৃতিতে একটি কবিতা — শরৎ চৌধুরী
একটি সংবাদ থেকে এই কবিতার শুরু। মেথিকান্দা রেলস্টেশন ছিল ববি বেগমের আশ্রয়। সংবাদমাধ্যমে তাঁর বয়স, এমনকি নামের বানান নিয়েও ভিন্নতা আছে; কিন্তু চল্লিশ হাজার টাকার অঙ্কটি বারবার ফিরে আসে। এই কবিতা সেই জানা সংখ্যা এবং অজানা মানুষটির মধ্যবর্তী দূরত্বে লেখা।
মেথিকান্দায় ট্রেন থামে।
মানুষ নামে।
মানুষ ওঠে।
কেউ ভৈরব যায়।
কেউ ঢাকা।
কেউ আরও দূরে।
একজন নারী
কোথাও যায় না।
ভোর হলে
সে ঝাঁট দেয়—
বাদামের খোসা,
ছেঁড়া টিকিট,
চায়ের কাপ,
পানের পিক,
মানুষের ফেলে যাওয়া
ছোট ছোট সত্য,
কিছু মিথ্যা।
তারপর ট্রেন আসে।
হুইসেল বাজে।
ট্রেন চলে যায়।
রেললাইন থেকে যায়।
নারীটিও।
এইটুকু ছাড়া
তাদের মধ্যে আর কোনো
আত্মীয়তা ছিল কি না
আমরা জানি না।
নারীটি কথা বলতে পারত না—
এমন লিখেছে সংবাদপত্র।
হয়তো সে কথা বলত
হাত দিয়ে,
চোখ দিয়ে,
মুখ ফিরিয়ে।
হয়তো আমরা
তার ভাষা জানতাম না।
তার একটি ঘর ছিল—
যদি পরিত্যক্ত একটি কক্ষকে
ঘর বলা যায়।
তার একটি নামও ছিল।
ববি বেগম।
আর কিছু টাকা।
দশ।
বিশ।
পঞ্চাশ।
একশো।
চল্লিশ হাজার।
কত ভোর,
কত ঝাঁট,
কত মানুষের
চলে যাওয়া—
আমরা জানি না।
সংবাদ শুধু
সংখ্যাটি জানে।
রাত তখন গভীর।
কয়েকজন মানুষ
তার ঘরে ঢুকেছিল।
তারা জানত
ববি কোথায় থাকে।
কোথায় টাকা রাখে।
সেই রাতে
হয়তো তার সমস্ত শরীর
একটি বাক্য হয়ে উঠেছিল।
আমরা পড়তে পারিনি।
তারপর একদিন
তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল
আরও দূরে।
এত বছর পর
ববি
মেথিকান্দা ছাড়ছিল।
কোনো স্টেশন পেছনে পড়লে
সে ফিরে তাকিয়েছিল কি না—
আমরা জানি না।
তারপর
অনেকেই তার নাম লিখল।
পুলিশ।
হাসপাতাল।
সংবাদপত্র।
ববি বেগম।
বয়স সত্তর
কিংবা আশি।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
বাক্প্রতিবন্ধী।
চল্লিশ হাজার টাকা।
শুধু লেখা গেল না—
সে কোন ট্রেনের শব্দ
সবচেয়ে ভালোবাসত,
কেউ কোনোদিন
তার জন্য এক কাপ চা
রেখে গিয়েছিল কি না,
এবং এত বছর
অন্যের চলে যাওয়া দেখতে দেখতে
একবারও
তার কোথাও যেতে
ইচ্ছে হয়েছিল কি না।
আমরা জানি না।
পরদিনও
মেথিকান্দায় ট্রেন থেমেছিল।
ঠিক সময়ে।
মানুষ নেমেছিল।
মানুষ উঠেছিল।
সময়সূচিতে
কোনো পরিবর্তন ছিল না।
শুধু প্ল্যাটফর্মে
কিছু ময়লা ছিল।