মেয়ের সাথে, রং বিষয়ক
“তুই বলবি—
বানাচ্ছি সহজ পৃথিবী,
বানাচ্ছি রঙের পৃথিবী।”
কিছু কবিতা লেখা হয় প্রকাশের জন্য। কিছু কবিতা লেখা হয় ভবিষ্যতের জন্য।
আর কিছু কবিতা লেখা হয় এমন একজন মানুষের জন্য, যে তখনও পৃথিবীকে পুরোপুরি চিনে ওঠেনি।
“মেয়ের সাথে, রং বিষয়ক” তেমনই একটি কবিতা।
এখানে একজন পিতা তার মেয়ের জন্য কোনো সম্পদ, বাড়ি, জমি বা উত্তরাধিকার রেখে যেতে চান না। কারণ তিনি জানেন, সবকিছু একদিন মিশে যাবে। যা থেকে যায়, তা হলো মানুষের দেখার ক্ষমতা, অনুভব করার ক্ষমতা, আর রং চিনে নেওয়ার ক্ষমতা।
এই কবিতায় রং শুধু রং নয়। রং এখানে জীবনের বহুত্ব, সম্পর্কের জটিলতা, মানুষের বৈচিত্র্য, অনুভূতির গভীরতা এবং কল্পনার স্বাধীনতার রূপক।
ভয়কে এখানে বলা হয়েছে রংহীন।
কারণ ভয় নিজে কিছু সৃষ্টি করে না। ভয় শুধু সংকুচিত করে, কঠিন করে, লোহার মতো করে তোলে। অথচ জীবন রঙিন হয় তখনই, যখন মানুষ ফুলের রং, পাখির রং, রক্তের রং, সম্পর্কের রং—সবগুলোকে আলাদা করে চিনতে শেখে।
এই কবিতা একই সঙ্গে একটি শিক্ষা, একটি সতর্কবাণী এবং একটি স্বপ্ন।
এটি এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষ ভয় দিয়ে নয়, রং দিয়ে পৃথিবী বানায়।
মেয়ের সাথে, রং বিষয়ক
মা, শোন তোর জন্য কিছুই রেখে যাচ্ছিনা আমি
রেখে যাবার মত কোন কিছুই এখানে নেই
এই যে দেখছিস আমাকে
একটা বুনো মানুষ
তার বুনো রঙটুকু শুধু আছে
এছাড়া সবকিছু মিশে যাবে নিমিষেই
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুই বড় হয়ে যাবি
কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুই দেখবি
সব কেমন হয়ে উঠবে লোহার মত
এরপর তোর দিকে তেড়ে আসবে
ভয় পাসনে
এরা কেউ আসছে না তোর দিকে
সবাই যাচ্ছে পিছিয়ে
যতই দেখবি হুঙ্কার, ধমক আর চোখ রাঙ্গানী
তখনি বুঝবি এরা পিছিয়ে যাচ্ছে শুধু
ভীষণ ভয় পেয়েছে
ভয়ের রং তো চিনিস
ঐ যে সেবার সাঁতার কাটতে যেয়ে খুব ভয় পেলি
সব কেমন দমবন্ধ লাগলো,
মনে হচ্ছিল মরে যাবি
ঠিক সেরকম
ভয়ের কোন রং হয়না
ভয় হল রংহীন
তাই তুই রং চিনবি
ফুলের রং, পাখির রং, রক্তের রং, সম্পর্কের রং
একদম বেছে বেছে কোনটার কি রকম
সবগুলো জানবি
শব্দের গন্ধ খুঁজে বের করবি,
আলোর উৎসবে কাকভেজা হয়ে হাসবি
নারীর কাছে যাবি, পুরুষের কাছে যাবি
যতই যাবি ততই বুঝবি সবই আসলে রং
তখন মিশ্র রং এর কাছে যাবি
মিশ্র মানুষের কাছে যাবি
মা, শোন একদম মন খারাপ করবি না
মন খারাপের তুলি বানাবি
আর চুপচাপ এঁকে যাবি
যার যা ইচ্ছে হয় বলুক
যার যা ইচ্ছে হয় শুনুক
তুই বলবি,
বানাচ্ছি সহজ পৃথিবী
মা, শোন বোকা মানুষ কতকিছু করে
তারা ভয় নিয়ে রং দেয় ঘরে
তারা নিভু নিভু হয়ে প্রতিদিন মরে
তারা ঝরে পড়ে লালা-লোভের জ্বরে
কিন্তু তাদের রং হয় না
তুই নিজের একটা রং বানাবি
নিশুতি রাতে যখন দোলনা চাঁপা ডাকে
ঠিক তার মত রং
মা, শোন তোর জন্য কিছুই রেখে যাচ্ছি না আমি
রেখে যাবার মত কোন কিছুই এখানে নেই
এখানে শুধু রং থাকে
তাই তোকে শিখিয়ে দিয়ে যাচ্ছি
রংএর যাদু
যার যা ইচ্ছে হয় বলুক
যার যা ইচ্ছে হয় শুনুক
তুই বলবি,
বানাচ্ছি সহজ পৃথিবী
বানাচ্ছি রঙের পৃথিবী।
শরৎ চৌধুরী
১২ মে ২০১৪
ঢাকা, বাংলাদেশ