শিশ্নবাদ, ফাঁস ও জনপরিসরের পতন: বাংলাদেশের ডিজিটাল স্ক্যান্ডাল অর্থনীতি
👉 আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে লজ্জা হারিয়ে যাচ্ছে—কিন্তু মুক্তি আসছে না।
এই বিষয়ে জনপরিসরে কথা বলা জরুরি। এই আলাপে না চাইলেও আমাদের কিছু কদর্য দৃশ্যের মুখোমুখি হতে হবে। আগেই বলে রাখি: এই লেখা আরামদায়ক নয়। কিন্তু অস্বস্তিকর বলেই জরুরি। কারণ আমরা এমন এক সমাজে এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে আড়াল ভেঙে পড়ছে, কিন্তু সত্য নয়; লজ্জা হারিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মুক্তি মিলছে না; উন্মোচন ঘটছে, কিন্তু ন্যায়বিচার নয়।
আমি একসময় ভাবতাম, মানুষ এমন এক প্রাণী যার আড়াল দরকার, আব্রু দরকার, লজ্জা দরকার, হায়া দরকার। “ভাবতাম” বলছি, কারণ এই সামষ্টিক ধারণাটিই আজ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। আমার জানামতে, মানুষ জনসমক্ষে মলত্যাগ করে না, জনসমক্ষে যৌনসংগম করে না, যত্রতত্র কাপড় খুলে ফেলে না, পিতা-মাতা সন্তানদের সামনে যৌনতায় লিপ্ত হন না, সন্তানরাও পিতা-মাতা বা অপরের সামনে তাদের অন্তরঙ্গতায় প্রবেশ করে না। এখন মনে হয়, হয় আমি ভুল জানতাম, নয়তো যেসবকে আমরা শোভনতা বলে জেনেছি সেগুলোকেই ভুল প্রমাণ করার এক ঐতিহাসিক আয়োজন চলছে।
বাংলাদেশ একটি চূড়ান্ত পরস্পরবিরোধী দেশ। এই দেশের প্রতিটি অঞ্চল, পাড়া, মহল্লায় সারাক্ষণ পর্দা, নারীর শরীর, শালীনতা, ইজ্জত, হায়া নিয়ে উচ্চবাচ্য, বয়ান, নির্দেশ, উপদেশ চলতে থাকে; কিন্তু কয়েক কদম হাঁটলেই পুরুষের প্রস্রাবের গন্ধে গলির মুখ ভরে ওঠে। কনসার্ট, মেলা, আনন্দ, ওয়াজ, ওরশ, পহেলা বৈশাখ—যে কোনো জনসমাবেশের শেষে দেখবেন, ইউরিনের গন্ধে একটি অংশ ভেসে যাচ্ছে। আমাদের এই বেসিক, প্রাকৃতিক, অপরিহার্য শারীরিক কাজটি শোভনভাবে সম্পাদন করার জন্য কোনো ন্যূনতম অবকাঠামো নেই। নারীদের জন্য তো আরও কম। বেডরুম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—নারীর মলমূত্র ত্যাগের জায়গাও অনিরাপদ, অসম্মানজনক, অনিশ্চিত। যেন দেশ হিসেবেই আমরা দেহের এই অনিবার্য কাজটিকে অপরাধ বানিয়ে ফেলেছি। আরও অপরাধ যৌনতা। “যৌন” শব্দটি উচ্চারিত হওয়া মাত্র দেহগুলো যেন কেঁপে ওঠে, পাড়ায়-মহল্লায় সাজসাজ রব পড়ে যায়, সমাজের সব পবিত্র প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়তে শুরু করে। কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলে না: আমাদের রাষ্ট্র কেন আমাদের দেহের প্রতি এত নির্মম? কেন আমাদের সবচেয়ে একান্ত এবং অপরিহার্য জৈবিক কাজের জন্যও শোভন, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নেই?
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া উপনিবেশের পর মানুষের ভেতরের জীবন এবং তার চূড়ান্ত বহুমুখী পরস্পরবিরোধিতা নগ্নভাবে সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমের এনোনিমিটি, অর্ধ-এনোনিমিটি, এবং যা খুশি করার সুযোগ মানুষের ভেতরের আড়ালটিকে টিকতে দেয়নি। “নগ্ন” শব্দটিও যেন তার পুরোনো গুরুত্ব হারিয়েছে। কারণ এখন সবাই কোনো না কোনোভাবে নেংটা। মানুষের যৌন তাগিদ আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, কৌতূহল আছে। ফলে ইনবক্সের কোনো না কোনো কোণে, কারো না কারো চ্যাটলগে, কারো আর্কাইভে, কারো ক্লাউডে, কারো ডাউনলোড ফোল্ডারে, কারো সার্চ হিস্ট্রিতে—নগ্নতার, গোপনীয়তার, কামনার, ফ্যান্টাসির ইতিহাস জমা হয়ে আছে। শুধু ব্যক্তিগত ডিভাইসে নয়—মূল সার্ভারে আছে, লোকাল আইপি প্রোভাইডারের কাছে আছে, প্ল্যাটফর্মের ডাটাসেন্টারে আছে, টেলিগ্রামে আছে, চ্যানেলে আছে, ফরোয়ার্ডে আছে। সামাজিক মাধ্যম যৌনতা ও গোপনীয়তার পূর্ববর্তী ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। প্রবাসী, একগামী, বহুগামী, বিকৃতগামী, সমকামী, বিষমকামী—সবাই কোনো না কোনো ডাটা এই সার্ভার-সভ্যতার হাতে তুলে দিয়েছে। অর্থাৎ কয়েকটি বহুজাতিক কংলোমারেটের কাছে আমরা সবাই উন্মুক্ত, সংরক্ষিত, সঞ্চালনযোগ্য। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ আমাদের প্রস্তুত না করেই আমাদের এই প্ল্যাটফর্ম-উপনিবেশের হাতে তুলে দিয়েছে।
পুরুষ যৌনপ্রত্যঙ্গের বহু নাম আছে: ধন, হোল, বিচি, মেশিন, আরও কত কী। নারীর প্রত্যঙ্গেরও আছে অগণিত নাম। তৃতীয় লিঙ্গের প্রত্যঙ্গেরও আছে নানা নাম, নানা লোকভাষা, নানা অপভাষা। যেটা নেই, সেটি হলো লজ্জা। লজ্জা বলে যে একটি সামাজিক ও নৈতিক বোধ আছে, সেটিই যেন এই সমাজ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। মনে পড়ে একদল ভাষা-বিপ্লবীর কথা—যারা সমাজের তথাকথিত “সংকীর্ণতা” ভাঙার নামে, ভাষার মধ্য দিয়ে বাস্তবতা তৈরির নামে, নির্বোধ সাহসিকতায় অশ্লীলতাকে জনপরিসরের ভাষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এর ফল হিসেবে “গালি-স্বাধীনতা”র যে বিস্ফোরণ ঘটল, তার রেশ আজ টেলিফিল্মে, নাটকে, সোপ অপেরায়, স্ট্যান্ড-আপে, কমেন্টে, রাজনৈতিক বক্তৃতায়, সংসদের ভাষায়, এবং আমাদের প্রতিদিনের কথাবার্তায় ছড়িয়ে আছে। যত্রতত্র মলত্যাগ যদি স্বাধীনতা হয়, কিংবা তোমার মলত্যাগের বিরুদ্ধে আমার মলত্যাগই যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য হয়, তাহলে সমাজের চারপাশ মলেই ভরে উঠবে। সেটাই হয়েছে। যাদের বয়স চল্লিশ, তারা পনেরো বছর পেছনে ফিরে তাকালেই দেখবেন—আপনার বয়স যখন পঁচিশ ছিল, তখন সমাজের ভাষা কেমন ছিল, আর এখন কেমন হয়েছে। ভাষার এই পরিবর্তনই বাস্তবতার পরিবর্তনের সাক্ষ্য। ভাষা কর্কশ হলে সমাজও কর্কশ হয়; ভাষা পচলে কল্পনাশক্তিও পচে।
শিশ্ন একটি প্রাকৃতিক অঙ্গ, যেমন যোনি। কিন্তু শিশ্ন শিশ্নই থাকে না যখন এটি কেবল শারীরিক অঙ্গ না থেকে একটি বিশেষ ইমেজ, একটি ভাষা, একটি রাজনীতি, একটি ক্ষমতা-ব্যাকরণে পরিণত হয়। তখন প্রত্যঙ্গ আর জৈবিক থাকে না; ক্ষমতার প্রতীকে রূপ নেয়। সেই জায়গা থেকেই আমি “শিশ্নবাজ” বা “শিশ্নবাদ” কথাটি ব্যবহার করছি। এখানে শিশ্ন কোনো অ্যানাটমিক্যাল বিষয় নয়; এটি একটি আধিপত্যের ব্যাকরণ। এর লক্ষণ কী? লজ্জাহীনতা। অনুমতিবিহীন প্রবেশ। অনধিকার চর্চা। অপরের সীমানা অস্বীকার। দখল। জাহির করা। মাস্তানি। অপমান। ভেদ করার আনন্দ। রক্তাক্ত করার কল্পনা। যাকে অনেকে ব্যাটাগিরি বলে, কেউ মেইল ইগো বলে, কেউ কর্তৃত্বপরায়ণতা বলে—আমি সেই গঠনের নাম দিচ্ছি শিশ্নবাদ। এটি উত্থিত তরবারির মতো দাঁড়িয়ে থাকে; প্রবেশ করতে চায়, চিহ্নিত করতে চায়, ক্ষত তৈরি করতে চায়। এই কারণেই এর সঙ্গে অস্ত্রের তুলনা আসে—মেশিন, বন্দুক, একে ফোর্টি সেভেন। তবে মনে রাখতে হবে, শিশ্নবাদ কেবল জৈবিক পুরুষের বৈশিষ্ট্য নয়। বহু নারী, বহু অন্য লিঙ্গের মানুষও শিশ্নবাদী হতে পারে। কারণ এটি শরীরের নয়, ক্ষমতার ভঙ্গি। অথরিটেরিয়ান সবাই কোনো না কোনো অর্থে শিশ্নবাদী।
আমরা গত সতেরো বছর বিরাট রকমের শিশ্নবাদীদের উত্থান ও দাপটের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছি। শিশ্নবাদ এই সমাজে আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আধিপত্যবাদী, অথরিটেরিয়ান রাজনৈতিক কাঠামো এটিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে। আজ দেখুন, পোস্ট-ফ্যাসিস্ট বলে নিজেদের দাবি করা অনেকের ভাষাও কী রকম শিশ্নবাদী—তাচ্ছিল্য আছে, মর্যাদাবোধ নেই, সীমা নেই, সংযম নেই, সুর নেই। ক্ষোভ থেকে প্রতিবাদে, রাজনীতি থেকে রসিকতায়—সবখানেই “ছিঁড়ে ফেলা”, “ধ্বংস করা”, “নষ্ট করে দেওয়া”, “ঘায়েল করা”, “উড়িয়ে দেওয়া”র ভাষা। ফ্যাসিস্টের ভাষা দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী হওয়া যায় না। অথচ আমাদের অনেক প্রতিবাদও আজ শিশ্নবাদী ভঙ্গিতে গঠিত।
অনেকের মনে থাকতে পারে—কয়েক বছর আগে ফেসবুকে এক রাজনৈতিক কর্মী জনপরিসরে প্রতিবাদ হিসেবে জিপার খুলে তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ’ প্রদর্শন করছিলেন। যেন শিশ্ন দিয়েই তিনি পৃথিবী জয় করবেন। এরও আগে অন্য এক যৌন বিপ্লবী, চটি-সাহিত্যিক, এক বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে ভাষার আরেক প্রদর্শনযুদ্ধ চালিয়েছিলেন। রাস্তাঘাটের প্রস্রাবজনিত দৈনন্দিন শিশ্নের সঙ্গে যুক্ত হলো রাজনৈতিক শিশ্ন। এরপর আর থামা নেই। তারপর আমরা বাধ্য হলাম নানান রকমের শিশ্নের মুখোমুখি হতে—প্রশাসনিক শিশ্ন, ধর্ম ব্যবহারকারী শিশ্ন, নাস্তিকতাকে ব্যবহারকারী শিশ্ন, জুলাইয়ের রাজপথে ক্ষমতার শিশ্ন, ইউএনওর শিশ্ন, মিডিয়ার শিশ্ন। আর “ফাঁস” হয়ে উঠল আমাদের বিনোদনের কেন্দ্র। আমাদের মনোজগতে শিশ্নবাদীতা এমনভাবে গেঁথে গেল যে আমরা আর সেটি আলাদা করে দেখতে শিখলাম না।
আমি ইংরেজিতে “Exposure Without Collapse” নামে একটি প্রবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করেছি যে নিউলিবারেল বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “ফাঁস” আর আগের অর্থ বহন করে না। এর একটি কারণ হলো—সমাজ ইতোমধ্যে এতটাই উন্মুক্ত, এতটাই সঞ্চালন-নির্ভর, এতটাই voyeuristic হয়ে গেছে যে “উন্মোচন” আর পতন ঘটায় না। এপস্টিন ফাইল থেকে শুরু করে গৃহবধূর গণধর্ষণের ভিডিও—এসব আর আমাদের নাড়া দেয় না, রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপান্তরিত করে না; বরং পুলকিত করে, উত্তেজিত করে, বিনোদিত করে। আমাদের লজ্জাবোধ কাজ করা বন্ধ করেছে। ফাঁস এখন আর ন্যায়বিচারের ভাষা নয়; এটি বাজারের ভাষা।
না, আমি আমার শিক্ষার্থীদের, বন্ধুদের, পিতা-মাতার, বোনের, ভাইয়ের, প্রতিবেশীর, অপরিচিতের ব্যক্তিগত গোপন শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও দেখতে চাই না। কিন্তু আমরা যে অনলাইন-অফলাইন সমাজে বাস করছি, সেখানে মনোযোগ-অর্থনীতি আমাদের সমাজকাঠামোর মৌলিক ভিত্তিকে ধাক্কা দিয়েছে। এখানেও আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রকাঠামো গভীরভাবে দায়ী। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য “ফাঁস”কে কৌশল হিসেবে বৈধতা দিয়েছে রাষ্ট্রই। এর শুরু হয়েছিল ফোনালাপ ফাঁসের মধ্য দিয়ে। তারপর গোয়েন্দা সংস্থা পরিণত হলো “ফাঁস সংস্থায়”, সাংবাদিকতা পরিণত হলো “ফাঁস সাংবাদিকতায়”, সংবাদপত্রের শিরোনাম পরিণত হলো “উন্মোচন”র নাট্যমঞ্চে। নতুন নতুন ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল, ডিজিটাল ট্যাবলয়েড অর্থ উপার্জন করতে শুরু করল “ফাঁস” বিক্রি করে। আমাদের বহু বিপ্লবীও সামাজিক প্রতিপত্তি গড়েছেন কারো না কারো “ফাঁস”কে পুঁজি করে। সমাজের কী হবে—এই প্রশ্নটি খুব কমই কেউ করেছে।
এখানেই এসে আমাদের একটু থামতে হবে। কারণ এই সংকটটি শুধু নৈতিক নয়; এটি গভীরভাবে অবকাঠামোগত। একটু ছোট্ট গবেষণা করলেই বোঝা যাবে আমাদের অবস্থা কী।
সাম্প্রতিক ডিজিটাল কেসগুলো দেখায় যে আজকের স্ক্যান্ডাল কেবল স্ক্যান্ডাল নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সঞ্চালন-অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। একাধিক ফেসবুক পোস্ট, সেগুলোর কমেন্ট, লিংক, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, শর্টইউআরএল, বট-সদৃশ কমেন্ট, ইনবক্স-ডাক, “ফুল ভিডিও”, “লিংক দেন”—সব মিলিয়ে একটি স্পষ্ট জীবনচক্র দেখা যায়:
গুজব → স্ক্যান্ডাল → ভাইরালতা → মিম → বাজার → নৈতিক প্রতিরোধ → পুনরায় সঞ্চালন।
প্রথমদিকে স্ক্যান্ডাল কৌতূহল তৈরি করে। তারপর তা খুব দ্রুত বিনোদন, সামাজিক রেফারেন্স, অংশগ্রহণমূলক হাস্যরস এবং “সবার জানা” এক সাংস্কৃতিক উপাদানে রূপ নেয়। স্ক্যান্ডাল আর “ঘটনা” থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি অ্যাক্সেস পয়েন্ট। অর্থাৎ একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ আর তথ্য খোঁজে না, প্রবেশপথ খোঁজে।
এই কেসগুলোর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো কমেন্ট সেকশন। সেখানে দেখা যায়—অধিকাংশ কমেন্টই আর মতামত নয়। সেগুলো লিংক, ইনবক্স, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল, টেলিগ্রাম গ্রুপ, “ভিডিও লাগলে নক দেন”, “ফলো করে ইনবক্সে আসেন”, “ডাইরেক্ট ডাউনলোড”—এইসব। অর্থাৎ কমেন্ট সেকশন আর deliberation-এর জায়গা নয়; এটি ডিমান্ড-সাপ্লাই সিস্টেমে রূপ নিয়েছে। কেউ চাহিদা জানাচ্ছে, কেউ জোগান দিচ্ছে, কেউ ট্রাফিক ঘুরিয়ে নিচ্ছে, কেউ কনভার্ট করছে। ফেসবুক পোস্ট মনোযোগ ধরে, কমেন্ট সেকশন আকাঙ্ক্ষাকে দৃশ্যমান করে, হোয়াটসঅ্যাপ-টেলিগ্রাম সেটিকে সঞ্চালিত করে, বাহ্যিক সাইট সেটিকে মোনিটাইজ করে। এ এক পূর্ণাঙ্গ attention economy pipeline।
এখানে একটি বড় আবিষ্কার হলো—আকাঙ্ক্ষা আর আড়ালে নেই। মানুষ কেবল গোপনে ভোগ করছে না; প্রকাশ্যে বলছে “লিংক দেন”, “ইনবক্সে আসেন”, “দেখতে চাই”, “সব দেখছি”। অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা এখন ডেটা, দৃশ্যমান, গণনাযোগ্য, এবং ব্যবসায়িক সম্পদ। ডিজিটাল পুঁজিবাদ ঠিক এই জায়গাটিতেই শক্তিশালী: যা একসময় লজ্জার, গোপনের, সংকোচের, তারও বাজার তৈরি করে।
এই পর্যবেক্ষণগুলো আপনার “ফাঁস সংস্কৃতি”র কথাকে আরও স্পষ্ট করে। ফাঁস এখন তিনটি জিনিস একসঙ্গে: রাজনৈতিক অস্ত্র, সামাজিক প্রতিপত্তির উৎস, এবং অর্থনৈতিক সম্পদ। ফলে ফাঁস আর কেবল উন্মোচন নয়; এটি মোনিটাইজেবল ইভেন্ট। যে “ফাঁস” একসময় হয়তো ক্ষমতাকে বিপদে ফেলতে পারত, এখন সেটিই প্ল্যাটফর্ম-চালিত বাজারে নতুন পণ্য। সুতরাং “ফাঁস”র নৈতিক সম্ভাবনা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে; এর জায়গা নিয়েছে সঞ্চালন।
এইখানেই “শিশ্নবাদ” ধারণাটি নতুন অর্থ পায়। কারণ এই ডিজিটাল অবকাঠামোয় আমরা দেখি: অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, গোপনীয়তা দখল, অপরের সীমা ভাঙা, উন্মোচনকে আধিপত্যে রূপান্তর করা, দৃশ্যমানতাকে নিয়ন্ত্রণে পরিণত করা। এক কথায়, intrusion + domination + circulation। এই অর্থে ডিজিটাল শিশ্নবাদ কেবল একটি রূপক নয়; এটি একটি কার্যকর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণী ধারণা। আধিপত্য এখানে কেবল দেহের উপর নয়; ডেটার উপর, আর্কাইভের উপর, সঞ্চালনের উপর, লজ্জার উপর, এবং স্মৃতির উপর।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এর ফিরতি প্রভাব। এই স্ক্যান্ডাল-অর্থনীতি সমাজকে শুধু অশ্লীল করে না; এটি সমাজের গঠন বদলে দেয়। লজ্জাবোধ ক্ষয় হতে থাকে। একসময় যা ভয়ংকর ছিল তা “আরেকটা কনটেন্ট” হয়ে যায়। গোপনীয়তা সামাজিকভাবে মরতে শুরু করে। মানুষ বিশ্বাস হারায়—বন্ধুত্বে, প্রেমে, দাম্পত্যে, সহকর্মিতায়। মাইক্রো-সার্ভেইলেন্স স্বাভাবিক হয়ে ওঠে: ফোন দেখা, চ্যাট দেখা, স্ক্রিনশট রাখা, ফাইল জমা করা। নারীদের জন্য জনপরিসর আরও অসম ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, কারণ তাদের শরীর এখনও সামাজিক সম্মান ও নৈতিকতার বাহক হিসেবে পড়া হয়। ভাষা আরও কর্কশ হয়ে যায়, রসিকতা আরও নিষ্ঠুর হয়, সাংবাদিকতা আরও চাঞ্চল্যনির্ভর হয়ে ওঠে, রাজনীতি আরও exposure warfare-এ নেমে যায়। জনপরিসর deliberation থেকে circulation-এ নেমে আসে। মানুষ কথা বলে কম, চালান করে বেশি; বিচার করে কম, সঞ্চালন করে বেশি।
সবচেয়ে শেষের বিপর্যয়টি আরও গভীর। মানুষ আর মানুষ থাকে না; সম্ভাব্য কনটেন্টে পরিণত হয়। তার ভুল, দুর্বলতা, ভয়, শরীর, গোপনতা—সবকিছুর বাজারমূল্য তৈরি হয়। সম্পর্কের জায়গা নেয় extractable material-এর কল্পনা। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অবিশ্বাস বাড়ে, কারণ মানুষ বুঝতে শেখে: রাষ্ট্র আমাকে রক্ষা করবে না; বরং আমার বিপন্নতাই অন্যের পণ্য হয়ে উঠবে।
এইখানে এসে প্রশ্ন দাঁড়ায়: সমাজ কি এখনও সমাজ আছে? নাকি এটি কেবল একটি সঞ্চালনযন্ত্র? একটি সমাজ তখনই সমাজ থাকে, যখন সেখানে কিছু অলিখিত সীমা থাকে—কোনটি দেখা যায় না, কোনটি ছড়ানো যায় না, কোনটি অপমান করা যায় না, কোনটি বাজারে তোলা যায় না। যখন এই সীমাগুলো ভেঙে পড়ে, তখন সমাজ আর মানুষের সমষ্টি থাকে না; তা হয়ে ওঠে পারস্পরিক ভক্ষণে অভ্যস্ত এক উত্তেজনা-সমাজ।
আমার কথা স্পষ্ট। দেহ, লজ্জা, নৈতিকতা, গোপনীয়তা—এসব নিয়ে আমাদের যে সংকট, সেটি কেবল সাংস্কৃতিক বা নৈতিক সংকট নয়। এটি রাষ্ট্র, পিতৃতন্ত্র, প্ল্যাটফর্ম, মনোযোগ-অর্থনীতি এবং শিশ্নবাদী আধিপত্যের যৌথ উৎপাদন। “ফাঁস” এখন প্রতিবাদের ভাষা নয়; বাজারের ভাষা। “উন্মোচন” এখন সত্যের পথে নিয়ে যায় না; ট্রাফিকের পথে নিয়ে যায়। “স্ক্যান্ডাল” এখন পতন ঘটায় না; সঞ্চালন ঘটায়।
এবং এ কারণেই আজ এই আলাপ জরুরি। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিশ্ন, রাষ্ট্র, স্ক্যান্ডাল, সাংবাদিকতা এবং প্ল্যাটফর্ম একসঙ্গে একটি নতুন জনপরিসর তৈরি করেছে। সেখানে সত্যের চেয়ে দ্রুত চলে লিংক, ন্যায়বিচারের চেয়ে বেশি বিক্রি হয় উন্মোচন, আর মানুষের মর্যাদার চেয়ে বেশি দাম পায় তার ফাঁস হওয়া শরীর। সেই শরীররের নৈতিকতার ইমেজ আবার ফিরিয়ে আনতে ব্যবহৃত হয় নতুন ইমেজ নির্মাণকারী ইনফ্লুয়েন্সাররা। চক্র সচল কিন্তু সমাজ বিকল।
শরৎ চৌধুরী, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬।