| | | |

নরক তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন শিশুর মৃত্যুতেও আমরা দল খুঁজি (শিশুর বিরুদ্ধে সমাজ পর্ব ৫)

অপ্রতিম, নিখোঁজ শিশুরা, রাষ্ট্রের ব্যর্থ মনোযোগ এবং বাংলাদেশের শিশুবিরোধী সামাজিক ব্যবস্থা

আমার হাত থরথর করে কাঁপছে। সমস্ত শরীরে অদম্য ক্রোধ আর ঘৃণা।

যে মায়ের সন্তানের কথা লিখতে বসেছি, সেই নাহিদা আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বান্ধবী। তার তেরো বছরের সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম আর বাড়ি ফিরবে না। মুখটা কালো হয়ে গেছে আমাদের বাবাটার। ভিডিওতে দেখছি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে পুরো পরিবার।

১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে অপ্রতিম বাসা থেকে বের হয়েছিল। ছবি তুলতে। সঙ্গে ছিল তার মায়ের ফোন। বয়স তেরো, সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বিকেল প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সে আর ফেরেনি। পরিবার খুঁজেছে। সেই রাতেই তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাহাড়সংলগ্ন একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ পাওয়া যায়। সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তার গতিপথ বোঝার জন্য বিভিন্ন জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ দেখা হয়েছিল; একটি প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্বজনদের সেই ফুটেজ ধরে অপ্রতিমের পথ অনুসরণ করার বিস্তারিতও আছে। পুলিশ একজন সন্দেহভাজন তরুণকে আটক করেছে; কিন্তু এই লেখা যখন লিখছি, হত্যার পূর্ণ ঘটনাক্রম ও উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন।

তেরো বছরের একটি ছেলে ছবি তুলতে বের হয়েছিল।

বাক্যটির মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকার কথা ছিল না। কয়েকটি ছবি তুলে তার ফিরে আসার কথা ছিল। হয়তো মা বকতেন ফোন নিয়ে বের হওয়ার জন্য। হয়তো সে একটু হেসে কথা ঘুরিয়ে দিত। তারপর রাতের খাবার, পড়াশোনা, স্কুল, বন্ধু, আরেকটি বিকেল। একটি শিশুর জীবন তো এমন অসংখ্য সাধারণ দিনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

অপ্রতিমের সেই সাধারণ দিনটি শেষ হলো একটি মরদেহে।

কিন্তু অপ্রতিমের হত্যার নৃশংসতার চেয়েও আরেকটি দৃশ্য আমাকে ভয় পাইয়েছে। একটি শিশু মারা যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের সামাজিক জনপরিসরের বড় একটি অংশে আরেকটি হিসাব শুরু হয়ে গেল—এই মৃত্যু কার রাজনৈতিক পক্ষে যাবে? কার বিপক্ষে যাবে? তার মা আগে কী লিখেছিলেন? কোন আন্দোলনে কী অবস্থান নিয়েছিলেন? আগে কার মৃত্যুতে তিনি কী বলেছিলেন? এখন যারা কাঁদছেন, তারা তখন কোথায় ছিলেন? আগের শাসনামলে কত শিশু মারা গেছে? এখন কতজন মারা যাচ্ছে?

একটি তেরো বছরের শিশুর মৃতদেহ পড়ে আছে, আর আমরা তার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছি—এই লাশটি কার?

আমি এর চেয়ে বড় নারকীয়তার উদাহরণ খুব কমই কল্পনা করতে পারি।

রাজনীতি অবশ্যই থাকবে। শিশুর মৃত্যু রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলবেই। রাষ্ট্র কী করেছে, পুলিশ কত দ্রুত কাজ করেছে, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কেমন, বিচার হবে কি না—এসব রাজনৈতিক প্রশ্ন এবং এসব প্রশ্ন করতেই হবে। কিন্তু রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা আর একটি মৃত শিশুকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা এক জিনিস নয়।

অপ্রতিম তার মায়ের রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়। কোনো সন্তান তার বাবা-মায়ের রাজনৈতিক অতীতের দায় বহন করে না। কোনো শিশুর জীবন পরিবারের রাজনৈতিক ঋণের জামানত নয়।

অথচ অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আমরা সেটিই করতে দেখেছি। পুরোনো রাজনৈতিক পোস্টের screenshot বের হয়েছে; কেউ বর্তমান শোকের বিপরীতে অতীতের বক্তব্য দাঁড় করিয়েছে; কেউ এমন ভাষায় কথা বলেছে যেন এক পক্ষের স্বজন হারানোর বেদনা আরেক পক্ষের শোকের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মুদ্রা। একই আলোচনার ভেতরেই অবশ্য অন্যরা প্রশ্ন তুলেছেন—রাজনৈতিক মতবিরোধ যত গভীরই হোক, একটি শিশুর মৃত্যু নিয়ে প্রতিশোধের আনন্দ কীভাবে সম্ভব?

আমাদের এখানে শোকও দলীয় হয়ে গেছে।

আমরা যেন বলছি—তুমি আমার মৃত শিশুর জন্য কাঁদোনি, আমি তোমারটির জন্য কাঁদব না। তোমার রাজনৈতিক পক্ষ আমার কষ্টকে স্বীকার করেনি, তাই তোমার সন্তান হারানোর কষ্টও আমার কাছে পূর্ণ কষ্ট নয়।

কিন্তু একটি শিশুকে হত্যা করার পরে যদি তার মানবিক মূল্য নির্ধারণের জন্যও আমাকে তার পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় জানতে হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়। আমাদের নৈতিক সমাজেই ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে।

অপ্রতিমের মৃত্যু অন্য কোনো শিশুর মৃত্যুকে ছোট করে না। হামে মারা যাওয়া শিশুর কথা বলার জন্য অপ্রতিমের শোককে অস্বীকার করতে হয় না। জুলাইয়ে নিহত শিশুর বিচার চাওয়ার জন্য অন্য সময়ের শিশুহত্যা ভুলে যেতে হয় না। মাদ্রাসায় ধর্ষিত একটি ছেলের কথা বললে ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয় না। দরিদ্র শিশুর জীবনের দাম বোঝাতে মধ্যবিত্ত শিশুর মৃত্যু নিয়ে মানুষের কান্নাকে ভণ্ডামি বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

শিশুর কোনো দল নেই।

তার জীবন আছে।

এই কথাটি বুঝতে আমাদের এত কষ্ট কেন?

আরও ভয়াবহ হলো, শিশুর মৃত্যু ঘটার পর তার শরীরটিও আমরা ছেড়ে দিই না। অপ্রতিমের মৃতদেহের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। একজন শোকাহত মানুষ লিখেছেন—ভিউ ও লাইক পাওয়ার জন্য যারা একটি শিশুর মরদেহের ছবি ছড়াচ্ছেন, তারা যেন একবার নিজের ঘরের শিশুটিকে অপ্রতিমের জায়গায় কল্পনা করেন।

কিন্তু আমি এখানেও আরেক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করতে চাই। নিজের শিশুকে তার জায়গায় কল্পনা করতে হবে কেন?

অপ্রতিম আমার সন্তান নয় বলেই কি তার মৃত শরীরের dignity কম?

একটি মৃত শিশুর শরীর news content নয়। তার শেষ দৃশ্য আমাদের engagement-এর কাঁচামাল নয়। মৃত্যুর পরও তার privacy-এর নৈতিক মূল্য আছে। তার মা কীভাবে তার সন্তানকে মনে রাখবেন, সেটি Facebook algorithm নির্ধারণ করবে কেন?

আমরা শিশুদের জীবিত অবস্থায় তাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করি, তাদের agency কমাই, তাদের privacy খুব কমই স্বীকার করি। মৃত্যুর পরও তাদের শরীরের ওপর আমাদের সামাজিক দখল শেষ হয় না। জীবিত শিশু আমাদের শাসনের বিষয়; মৃত শিশু আমাদের content।

এখানেই একটি গভীর ধারাবাহিকতা আছে।

শিশু আক্রান্ত হলেই আমরা প্রায়ই প্রথমে বলি—সন্তান কোথায় যায় খেয়াল রাখুন, কার সঙ্গে মেশে দেখুন, ফোন দেখুন, বাইরে কম যেতে দিন, সন্ধ্যার আগেই ফিরিয়ে আনুন।

পরিবারের সতর্কতা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই ভাষাটির ভেতরে একটা বিপজ্জনক স্থানান্তর ঘটে।

রাস্তা নিরাপদ নয়—শিশুকে ঘরে রাখুন।

প্রতিষ্ঠান নিরাপদ নয়—ভালো প্রতিষ্ঠান বেছে নিন।

সমাজে যৌন শিকারি আছে—শিশুকে সাবধান করুন।

শিশু নিখোঁজ হয়—তার বন্ধুবান্ধবের ওপর নজর রাখুন।

অর্থাৎ সমাজের নিরাপত্তা-ব্যর্থতার শাস্তি শেষ পর্যন্ত শিশু দেয় তার স্বাধীনতা দিয়ে।

আমরা রাস্তা বদলাই না, শিশুর চলাচল বদলাই। প্রতিষ্ঠান বদলাই না, শিশুর আচরণ বদলাই। রাষ্ট্রের সুরক্ষা-ব্যবস্থা শক্তিশালী করি না, পরিবারের নজরদারি বাড়াই।

এভাবে নিরাপদ শিশুর শেষ সংজ্ঞা দাঁড়ায়—ঘরে থাকা শিশু।

এটি নিরাপত্তা নয়। এটি শৈশবকে ছোট করে দেওয়া।

একটি তেরো বছরের ছেলে ছবি তুলতে যাবে না? একটি এগারো বছরের শিশু মসজিদে যাবে না? স্কুল থেকে ফিরবে না? মাঠে খেলবে না? বন্ধুর সঙ্গে হাঁটবে না? একটু দূরে গিয়ে পৃথিবী দেখবে না?

শৈশবের অন্যতম কাজই তো পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

সভ্য সমাজের কাজ শিশুকে পৃথিবী থেকে প্রত্যাহার করা নয়। পৃথিবীটাকে এমন করা, যেখান থেকে শিশুটি আবার বাড়ি ফিরতে পারে।

অপ্রতিমের ঘটনায় এখানেই রাষ্ট্রের প্রশ্নটি আসে।

আমি এখনই লিখতে চাই না যে পুলিশ কিছুই করেনি। সে দাবি প্রকাশিত তথ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ বলেছে তারা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করেছে; আবার bdnews24-এর প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্বজনেরা সকাল থেকে বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপ্রতিম ও আরেকজনের গতিপথ অনুসরণ করে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা বলেছেন।

এই অস্পষ্টতাই বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রথম এক ঘণ্টায় কী করা হয়েছিল? তিন ঘণ্টায়? ছয় ঘণ্টায়? কোন ফুটেজ কখন সংগ্রহ করা হয়েছিল? তার ফোনের শেষ অবস্থান জানার পরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? যাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল তাদের কখন খুঁজে দেখা হয়েছিল? কোন ইউনিটকে কখন সতর্ক করা হয়েছিল?

এই প্রশ্ন কারও চাকরি খাওয়ার জন্য নয়। এই প্রশ্ন পরের শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য।

অপ্রতিমকে আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিলে বাঁচানো যেত কি না—আমি জানি না। এই মুহূর্তে তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো তথ্য নেই। কিন্তু তাকে জীবিত ফেরানোর সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ করার জন্য রাষ্ট্র তার সম্পূর্ণ সামর্থ্য ব্যবহার করেছিল কি না, সেটি জানার অধিকার আমাদের আছে।

কারণ শুধু মৃত শিশুর হত্যাকারী শনাক্ত করতে পারলেই child protection হয় না।

আমাদের দরকার জীবিত নিখোঁজ শিশুর রাষ্ট্র।

এই কথাটি আজ আরও জরুরি, কারণ অপ্রতিমের মৃত্যুর পর সামাজিক মাধ্যমে একের পর এক নিখোঁজ শিশুর পোস্ট সামনে আসছে। আপনার নিউজফিডে হয়তো আপনি সিয়াম, আবু হানিফা, তাহসিন, তাসিন, মোহাম্মদ আলী, সালমান, ফারিয়া, নাঈম—এমন বহু শিশুর মুখ দেখেছেন। যে উপকরণ আমি দেখেছি, তাতে ১০, ১১, ১২, ১৩ বছরের একাধিক শিশুর missing alert পাশাপাশি রয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে নির্দিষ্ট বয়সের বহু শিশু সম্প্রতি নিখোঁজ হয়েছে। আমি সেই aggregate সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারিনি। কতজন ফিরে এসেছে, কতটি অপরাধের ঘটনা, কতটি পারিবারিক বা অন্য ধরনের ঘটনা—সে breakdown-ও আমাদের হাতে নেই। ফলে এখান থেকে কোনো “নতুন শিশু-অপহরণ চক্র” আবিষ্কার করা দায়িত্বহীন হবে।

কিন্তু আরও জরুরি প্রশ্ন আছে: এই তথ্য আমাদের Facebook পোস্ট গুনে বের করতে হচ্ছে কেন?

কত শিশু নিখোঁজ হচ্ছে, তাদের বয়স কত, কোন অঞ্চল থেকে, কতজন ফিরে এসেছে, কতজন অপরাধের শিকার হয়েছে, প্রথম কয়েক ঘণ্টায় রাষ্ট্র কী response দিয়েছে—এসবের একটি নির্ভরযোগ্য, বিশ্লেষণযোগ্য জাতীয় ব্যবস্থা থাকা উচিত। নিখোঁজ শিশুর ছবি viral হওয়া কোনো child-protection system নয়।

বাংলাদেশে শিশুদের সংকট যে গভীর, তার জন্য শুধু social-media anecdote-এর ওপর নির্ভর করতে হয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও UNICEF-এর ২০২৫ সালের জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল Multiple Indicator Cluster Survey-তে দেখা গেছে, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ৮৫.৭ শতাংশ জরিপের আগের এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে শারীরিক শাস্তি এবং/অথবা psychological aggression-এর অভিজ্ঞতা পেয়েছে। ১০–১৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে হার ৮০.৯ শতাংশ। একই জরিপে ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯.২ শতাংশ child labour-এ যুক্ত বলে পাওয়া গেছে।

অপ্রতিমের হত্যার সঙ্গে এই পরিসংখ্যানকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। একটি হত্যাকাণ্ড এবং পরিবারের violent discipline একই ধরনের ঘটনা নয়। কিন্তু তথ্যটি আমাদের একটি বড় সামাজিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়: শিশুর শরীরের ওপর সহিংস নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশে কোনো বিরল ঘটনা নয়।

২০২৬ সালের মে মাসে UNICEF বাংলাদেশে ছেলে ও মেয়ে শিশুদের ধর্ষণ, হত্যা ও অন্যান্য নৃশংস সহিংসতার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ জানায়। তাদের বক্তব্যে শুধু শাস্তির কথা ছিল না। বলা হয়েছিল prevention, reporting, institutional safeguarding, child-friendly police and justice, community protection এবং social services-এর ঘাটতি পূরণের কথা; বিশেষভাবে schools, madrasas, workplaces, neighbourhoods এবং care settings-এর জবাবদিহি শক্তিশালী করার কথা।

এই জায়গাটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আমরা প্রায় সব সমস্যার শেষে বলি—বিচার চাই।

অবশ্যই বিচার চাই।

অপ্রতিমের হত্যাকারীর বিচার চাই। শিশু ধর্ষণের বিচার চাই। মাদ্রাসা, স্কুল, পরিবার বা অন্য কোথাও নির্যাতনের শিকার শিশুর বিচার চাই। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সেই দায়িত্বহীনতারও বিচার চাই।

কিন্তু বিচার দিয়ে এই মহারোগ সারে না।

বিচার সাধারণত আসে ঘটনার পরে।

শিশুটি ধর্ষিত হওয়ার পরে।

শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পরে।

শিশুটির শরীর ভেঙে যাওয়ার পরে।

শিশুটি মারা যাওয়ার পরে।

আমরা কি শুধু ঘটনার পরের রাষ্ট্র চাই?

ঘটনার আগের রাষ্ট্র কোথায়?

একটি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার আগেই safeguarding কোথায়? একটি স্কুলে অভিযোগ করার নিরাপদ ব্যবস্থা কোথায়? একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কী automatic protocol চালু হয়? একজন ছেলে যদি বলে তার সঙ্গে যৌন সহিংসতা হয়েছে, পুলিশ, চিকিৎসক, পরিবার ও আইন তাকে কীভাবে গ্রহণ করে? কমিউনিটিতে শিশুর জন্য trained social worker কোথায়? শিশুর নিরাপত্তা সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ের নিয়মিত তথ্য, পর্যবেক্ষণ ও accountability কোথায়?

Criminal justice দরকার।

কিন্তু criminal justice আর child protection একই জিনিস নয়।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয়; শিশুকে অপরাধের শিকার হওয়া থেকে যতটা সম্ভব রক্ষা করা।

এই জায়গায় বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জনপরিসরের প্রতিও আমার প্রচণ্ড ক্ষোভ আছে।

আমরা রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলি। ক্ষমতা নিয়ে কথা বলি। নির্বাচন নিয়ে কথা বলি। কে আসবে, কে যাবে, কে কাকে হারাবে, কোন মৃত রাজনৈতিক নেতাকে ইতিহাসে কোথায় বসানো হবে—এগুলো নিয়ে আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা আছে, টকশো আছে, Facebook essay আছে, তর্ক আছে।

এই বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয়—আমি তা বলছি না।

আমি শুধু জানতে চাই, জীবন্ত শিশুর জন্য আমাদের সময় কত?

মৃত ইতিহাস নিয়ে আমাদের অসীম সময় আছে। জীবন্ত শিশু নিয়ে দশ মিনিটও কি আছে?

আমাদের টকশোয় child safeguarding কোথায়? মাদ্রাসায় শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে sustained national discussion কোথায়? নিখোঁজ শিশুর প্রথম কয়েক ঘণ্টা নিয়ে professional police protocol-এর আলোচনা কোথায়? ছেলে শিশুর sexual victimhood নিয়ে public education কোথায়? শিশুশ্রম, child-friendly policing, public-space safety—এসব কি কখনো ক্ষমতার আলোচনার সমান গুরুত্ব পায়?

শিশু মারা গেলে সে headline হয়।

শিশু কীভাবে বাঁচবে, সেটি agenda হয় না।

এটাই আমাদের attention-এর ভয়াবহ ব্যর্থতা।

রাষ্ট্রের কাছে শিশুটি এক অদ্ভুত নাগরিক। জাতীয় দিবসে সে দেশের ভবিষ্যৎ। উন্নয়ন বক্তৃতায় সে মানবসম্পদ। স্কুলের পরিসংখ্যানে সে enrolment। ভোটের সময় তার বাবা-মা নাগরিক। কর দেওয়ার সময় তারা নাগরিক।

কিন্তু শিশুটি নিখোঁজ হলে ব্যাপারটি দ্রুত হয়ে যায় তার পরিবারের সমস্যা।

মাদ্রাসায় নির্যাতিত হলে পরিবারের লজ্জা।

দরিদ্র হলে পরিবারের অসহায়ত্ব।

রাস্তায় নিরাপদ না হলে অভিভাবকের অসতর্কতা।

রাষ্ট্র ভবিষ্যতের নাগরিক দাবি করে। কিন্তু শিশুটি রাষ্ট্রের কাছে দাবি করে তার বর্তমান জীবন।

এই দাবি কি খুব বেশি?

নারকীয় সমাজের মাংসের দোকান

এইসব ঘটনা পাশাপাশি রাখতে রাখতে আমার সামনে বারবার একটি ভয়ংকর দৃশ্য ভেসে ওঠে।

মনে হয় আমরা একটি বিশাল মাংসের দোকানে বাস করছি।

এখানে মানুষ শুধু মাংস কেনাবেচা করে না। এখানে মানুষকেই ধীরে ধীরে মাংসে নামিয়ে আনা হয়।

দরিদ্র শিশু তার শৈশব শ্রমে বিক্রি করে। নির্যাতিত শিশুর শরীর কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের সঙ্গে দরকষাকষির বিষয় হয়। নিখোঁজ শিশুর মুখ পোস্টারে পরিণত হয়। মৃত শিশুর শরীর content হয়। কান্না engagement হয়। শোক রাজনৈতিক পুঁজি হয়। ভয় বাজারযোগ্য হয়। আর একটি তেরো বছরের শিশুর মৃত্যু ঘটার পর আমরা হিসাব করি—এই লাশ কার রাজনৈতিক কাজে লাগবে।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, আমরা শুধু এই মাংসের দোকানের ক্রেতা নই।

আমরা তার শ্রমিকও।

আমরা নিজেরাই অন্য মানুষের শরীর process করি। তার যন্ত্রণা package করি। তার কান্নাকে caption দিই। তার মৃতদেহ share করি। তার শোক থেকে রাজনৈতিক অর্থ বের করি। তারপর সেটি consume করি এবং পরের content-এ চলে যাই।

যে process মানুষকে মাংসে নামিয়ে আনে, আমরা সেই process-এর কর্মীও, ভোক্তাও, এবং শেষ পর্যন্ত শিকারও।

আজ conveyor belt-এ অন্য কারও সন্তান।

কাল আমার।

তখন আমি বুঝি—যাকে এতদিন “আরেকটি ঘটনা”, “আরেকটি লাশ”, “আরেকটি সংখ্যা” হিসেবে দেখেছি, সে আসলে কারও অপ্রতিম ছিল।

এই dystopia-র সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ হত্যাকাণ্ড নয়।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, আমরা এই অবস্থাকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতে শিখছি।

নরক শুধু সেই জায়গা নয় যেখানে একটি শিশু খুন হয়।

নরক সেই জায়গা যেখানে শিশুর মৃত্যুর পর আমরা প্রথমে দল খুঁজি।

নরক সেই জায়গা যেখানে তার মায়ের পুরোনো রাজনৈতিক পোস্ট খুঁজে তার সন্তানের মৃত্যুর পাশে বসাই।

নরক সেই জায়গা যেখানে “তোমাদের শিশুও মরেছিল, এখন তোমাদেরটা মরেছে”—এমন হিসাব সম্ভব হয়।

নরক সেই জায়গা যেখানে মৃত শিশুর শরীরও content হয়ে যায়।

নরক সেই জায়গা যেখানে শিশুর ধর্ষণের খবরের পরও কোনো প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা শিশুটিকে রক্ষার চেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে।

নরক সেই জায়গা যেখানে নিরাপদ রাস্তা বানাতে না পেরে আমরা শিশুকে ঘরে আটকে রাখি।

নরক সেই জায়গা যেখানে প্রতিটি হত্যার পরে আমরা কঠোর শাস্তি চাই, কিন্তু পরবর্তী শিশুটিকে বাঁচানোর প্রতিষ্ঠান তৈরির প্রশ্ন কয়েক দিনের মধ্যে ভুলে যাই।

আর নরক তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন এতকিছুর মধ্যেও আমরা বুঝতে পারি না যে আমরা নরকের মধ্যে আছি।

আমি মানুষকে অবমানব বলতে চাই না।

বরং আমার ভয়টি আরও গভীর।

আমরা একটি অবমানবিক অবস্থার মধ্যে বাস করছি। এমন একটি সামাজিক condition, যেখানে অন্য মানুষের যন্ত্রণা বোঝার জন্যও আমাকে বলা হয়—নিজের সন্তানকে তার জায়গায় বসান।

আমি কেন বসাব?

অপ্রতিম নিজে কি যথেষ্ট ছিল না?

তার জীবনকে মূল্যবান মনে করার জন্য তাকে আমার ছেলে হতে হবে কেন?

একটি নামহীন দরিদ্র শিশুকে ভালোবাসার জন্য আমাকে তার বাবাকে চিনতে হবে কেন?

মাদ্রাসায় নির্যাতিত ছেলেটির জন্য কাঁদতে আমার তাকে আত্মীয় ভাবতে হবে কেন?

মানুষের জীবন যদি সম্পর্ক, দল, শ্রেণি, ধর্ম বা পরিচিতির অনুমোদন ছাড়া আমাদের কাছে পূর্ণ জীবন হয়ে উঠতে না পারে, তাহলে আমরা যে সমস্যার মধ্যে আছি সেটি কেবল crime problem নয়।

এটি dehumanization-এর সমস্যা।

আমাদের বিপর্যয় শুধু এই নয় যে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। আরও গভীর বিপর্যয় হলো, শিশু আক্রান্ত হতে হতে আমরা এমন সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে একটি শিশুর যন্ত্রণাও আর নিজে থেকে যথেষ্ট নৈতিক ঘটনা নয়।

তার সঙ্গে দল লাগাতে হয়।

শ্রেণি লাগাতে হয়।

ধর্ম লাগাতে হয়।

viral ছবি লাগাতে হয়।

পরিচিত মা-বাবা লাগতে হয়।

তবেই আমরা তাকাই।

সেই কারণেই অপ্রতিমের জন্য মানুষের ব্যাপক শোককে আমি ছোট করতে চাই না। বরং প্রশ্নটি উল্টো।

প্রতিটি শিশুর জন্য আমরা এমনভাবে কাঁপি না কেন?

অপ্রতিমের একটি নাম আছে, মুখ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়-সম্প্রদায় আছে, পরিচিত মানুষ আছে। তাই তার মৃত্যু দ্রুত আমাদের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু হামে মারা যাওয়া দরিদ্র শিশুটিরও নাম ছিল। শিশুশ্রমে ঢুকে যাওয়া ছেলেটিরও হয়তো বিকেলে ক্রিকেট খেলার কথা ছিল। ধর্ষিত ছেলেটিরও একটি পছন্দের খাবার ছিল। যে মেয়েটি নিখোঁজ হয়ে Facebook-এর একটি ছোট poster হয়ে গেছে, তারও মা হয়তো রাতে দরজা খুলে বসে আছে।

সংখ্যা একটি শিশুর মানবিকতা বাতিল করে না।

আমাদের তাই শুধু শাস্তির রাষ্ট্র নয়, শিশু-সুরক্ষার রাষ্ট্র দরকার। missing-child response-এর প্রথম ঘণ্টাগুলোকে জরুরি হিসেবে নেওয়া দরকার। স্কুল, মাদ্রাসা, আবাসিক প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র—যেখানেই শিশু থাকে, সেখানে কার্যকর safeguarding দরকার। অভিযোগ করার নিরাপদ পথ দরকার। ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুর victimhood-কে স্বীকার করে এমন পুলিশ, চিকিৎসা ও বিচারব্যবস্থা দরকার। নিখোঁজ শিশুদের নির্ভরযোগ্য, সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা দরকার। trained social work এবং community child protection দরকার। আর সবচেয়ে বেশি দরকার—শিশুর জীবনকে sustained public priority বানানো।

এটি অসম্ভব কোনো কল্পনা নয়। UNICEF-এর সাম্প্রতিক অবস্থানও prevention, reporting, institutional safeguarding, child-friendly justice, community protection ও social services শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছে। অর্থাৎ শুধু অপরাধের পরে শাস্তি নয়—শিশুকে আগেই রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করাই মূল কাজ।

কিন্তু তার জন্য আমাদের মনোযোগ বদলাতে হবে।

প্রতিদিন নতুন ইস্যু আসবে। ক্ষমতার লড়াই থাকবে। ইতিহাস থাকবে। নির্বাচন থাকবে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থাকবে। ধর্ম থাকবে। বিতর্ক থাকবে।

কিন্তু একটি শিশুর তেরো বছর বয়স একবারই আসে।

তার শৈশব একবারই আসে।

তার জীবন একবারই আসে।

অপ্রতিম ছবি তুলতে বের হয়েছিল।

এই তথ্যটি আমাকে বারবার থামিয়ে দেয়।

ছবি তোলা মানে বর্তমানের একটি মুহূর্তকে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়া। একটি তেরো বছরের শিশু সেদিন হয়তো পৃথিবীর কয়েকটি মুহূর্ত ধরে রাখতে বেরিয়েছিল।

এখন তার নিজের ছবিগুলোই অন্যরা ধরে রাখবে।

নাহিদাকে কোনো বিচার তার সন্তান ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কোনো পুলিশি সাফল্য, কোনো আদালতের রায়, কোনো রাষ্ট্রীয় বিবৃতি তাকে আবার সেই বিকেলটি দেবে না।

কিন্তু অপ্রতিমের পরে আরও শিশু দরজা খুলবে।

তারা স্কুলে যাবে। নামাজ পড়তে যাবে। ছবি তুলতে যাবে। মাঠে খেলবে। বন্ধুর সঙ্গে হাঁটবে। কখনো বাবা-মায়ের কথা অমান্য করবে। কখনো একটু দূরে চলে যাবে।

এগুলো অপরাধ নয়।

এগুলো শৈশব।

তাদের রক্ষার সমাধান পৃথিবী থেকে তাদের প্রত্যাহার করা নয়।

পৃথিবীটাকে তাদের জন্য বাসযোগ্য করা।

এই কারণেই অপ্রতিমের হত্যাকারীর বিচার চেয়ে আমি থামতে পারি না।

আমার প্রশ্ন আরও বড়।

পরের অপ্রতিম বাড়ি থেকে বের হলে কী বদলাবে?

আমরা কি আবার তার মাকে বলব—আরও খেয়াল রাখতেন?

আবার নিখোঁজের poster share করব?

আবার মৃতদেহ পাওয়ার পরে ক্ষোভে ফেটে পড়ব?

আবার তার রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজব?

আবার কয়েক দিন পরে নতুন ইস্যুতে চলে যাব?

নাকি এবার আমরা সত্যিই সিদ্ধান্ত নেব যে বাংলাদেশের শিশুদের বাঁচিয়ে রাখা কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত প্রকল্প নয়?

এটি রাষ্ট্রের কাজ।

এটি সমাজের কাজ।

এটি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জনপরিসরের কাজ।

এটি আমাদের রাজনীতির কাজ।

এটি আমাদের ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ।

এটি আমাদের প্রত্যেকের কাজ।

আমরা Facebook-এ প্রতিদিন শত বিষয়ে সময় দিই। মৃত মানুষ নিয়ে লড়ি, পুরোনো ইতিহাস নিয়ে লড়ি, ক্ষমতার আগামী দৃশ্য নিয়ে লড়ি।

জীবন্ত শিশুদের জন্য অন্তত দশ মিনিট রাখব কি?

কারণ একটি সমাজের সভ্যতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি শেষ পর্যন্ত খুব সাধারণ।

একটি শিশু বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল।

রাতে সে কি আবার দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে পেরেছে?

অপ্রতিম পারেনি।

পরের শিশুটিকে পারতেই হবে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *