পায়ের মেধাপাচার: বিশ্বকাপের বৈচিত্র্য আসলে কার সাফল্য?
কানাডার জাতীয় সংগীত বাজছে। সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন আলফোনসো ডেভিস। আজ তিনি কানাডার জাতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রধান প্রতীক; অথচ তাঁর জীবনের শুরু কানাডায় নয়। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে তাঁর বাবা-মা আশ্রয় নিয়েছিলেন ঘানার একটি শরণার্থী শিবিরে। সেখানেই ডেভিসের জন্ম। পাঁচ বছর বয়সে পরিবারটি কানাডায় পুনর্বাসিত হয়। নিরাপত্তা, শিক্ষা, ক্লাব ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়া সেই শরণার্থী শিশুই পরে কানাডার জাতীয় প্রতীকে পরিণত হন।
ডেভিসের গল্প শুনলে প্রশ্নটি আর শুধু “তিনি কোন দেশের?” থাকে না। প্রশ্ন হয়—একজন খেলোয়াড়কে আসলে কতগুলো পরিবার, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও ইতিহাস মিলে তৈরি করে?
২০২৬ বিশ্বকাপের ১,২৪৮ খেলোয়াড়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এমন দেশে জন্মেছেন, যে দেশের হয়ে তাঁরা খেলছেন না। কুরাসাও, ডিআর কঙ্গো ও মরক্কোর মতো কয়েকটি দলে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অভিবাসন তাই বিশ্বকাপের ব্যতিক্রম নয়; এর কাঠামোগত বাস্তবতা।
এই বাস্তবতাকে বোঝাতে সম্প্রতি দুই গবেষক “leg drain” ধারণাটি ব্যবহার করেছেন—brain drain বা মেধাপাচারের ফুটবলীয় প্রতিরূপ। ৯২ হাজারের বেশি পেশাদার ফুটবলারের তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁদের প্রাথমিক গবেষণার দাবি, বহু-জাতীয় যোগ্যতার ব্যবস্থায় ধনী ইউরোপীয় দেশগুলো সামগ্রিকভাবে বেশি খেলোয়াড়মূল্য লাভ করে; বিপরীতে ছোট, দরিদ্র, আফ্রিকান ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর ক্ষতি তাদের অর্থনীতির তুলনায় বেশি। সাবেক ঔপনিবেশিক সম্পর্কও এই প্রবাহের শক্তিশালী পূর্বাভাস। গবেষণাটি অবশ্য এখনো peer-reviewed নয় এবং খেলোয়াড়ের আনুমানিক বাজারমূল্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, একটি জরুরি সতর্কসংকেত।
বাংলায় একে বলা যেতে পারে—পায়ের মেধাপাচার।
কিন্তু মানুষ কোনো রাষ্ট্রের সম্পত্তি নয়। একজন খেলোয়াড়ের নিজের ক্যারিয়ার, নাগরিকত্ব ও পরিচয় নির্বাচনের অধিকার রয়েছে। ডেভিসকে কানাডার হয়ে খেলতে দেখে তাই বলা যায় না, কানাডা লাইবেরিয়ার প্রতিভা “চুরি” করেছে। তাঁর পরিবারকে কানাডা আশ্রয়, নিরাপত্তা ও বেড়ে ওঠার প্রতিষ্ঠান দিয়েছে। প্রশ্নটি খেলোয়াড়ের চলাচল বন্ধ করার নয়; প্রশ্ন হলো—প্রতিভা তৈরির সামাজিক ব্যয়, পেশাগত সুযোগ এবং তাঁর শ্রম থেকে উৎপন্ন অর্থনৈতিক ও প্রতীকী সুফল কীভাবে বণ্টিত হচ্ছে?
আমাদু ওনানার জীবন এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করে। সেনেগালে জন্মানো ওনানা ১১ বছর বয়সে মা ও ছোট বোনের সঙ্গে ব্রাসেলসে যান। প্রথম দিকে কেউ তাঁদের বাড়ি ভাড়া দিতে চাইছিল না; সামাজিক সেবার সহায়তায় পরিবারটি নতুন জীবন শুরু করে। বয়সভিত্তিক ফুটবলে দর্শকসারি থেকে তাঁকে নিজের দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল। অথচ একই বেলজিয়ামের সামাজিক প্রতিষ্ঠান তাঁর পরিবারকে খাবার দিয়েছে, হাসপাতাল তাঁর বোনকে চিকিৎসা দিয়েছে, স্কুল তাঁকে বন্ধু দিয়েছে এবং football academy তাঁর সামনে পেশার দরজা খুলে দিয়েছে। পরে তিনি বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে খেলেছেন।
ওনানার জীবন তাই একই সঙ্গে বর্ণবাদ ও welfare state-এর গল্প। যে সমাজ তাঁকে অপমান করেছে, সেই সমাজের প্রতিষ্ঠানই তাঁকে নাগরিক জীবনের বাস্তব সুযোগ দিয়েছে। তাঁর জাতীয় জার্সি বৈষম্য মুছে দেয় না; আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অস্বীকারও করতে দেয় না।
এমবাপ্পের গল্পে আমরা আরেক ধরনের পথ দেখি। তিনি শরণার্থী ছিলেন না; জন্ম ও বেড়ে ওঠা প্যারিসের Bondy-তে। তাঁর বাবা ছিলেন তাঁর প্রথম কোচ। সপ্তাহের দিনগুলোতে তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত Clairefontaine academy-তে প্রশিক্ষণ নিতেন, আর সপ্তাহান্তে ফিরতেন AS Bondy-তে—যেখানে ফুটবল ছিল তাঁর ভাষায় “বাস্তব জীবন”। এমবাপ্পে লিখেছেন, প্যারিসের banlieue-কে বাইরে থেকে অপরাধ ও বিপদের জায়গা হিসেবে দেখা হলেও তাঁর কাছে সেটি ছিল আফ্রিকান, আরব, এশীয় ও ফরাসি জীবনের মিলনভূমি। ২০১৮ বিশ্বকাপে Ousmane Dembélé-র পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ভেবেছিলেন—Évreux-এর একটি ছেলে এবং Bondy-র একটি ছেলে আজ ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ খেলছে। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট: banlieue-র শিশুরাও ফ্রান্স।
এখানেই diversity-র সত্যিকারের শক্তি। যেসব শহরতলি ও অভিবাসী পরিবারকে জাতির প্রান্তে রাখা হয়, তাদের সন্তানরা জাতীয় জার্সি পরে জাতির কেন্দ্রীয় দৃশ্যে দাঁড়ায়।
কিন্তু প্রতিনিধিত্বের বৈচিত্র্য আর সুযোগের ন্যায়বণ্টন এক বিষয় নয়। খেলোয়াড়দের মুখ ও পারিবারিক ইতিহাসে বৈচিত্র্য থাকতে পারে; অথচ উন্নত academy, sports science, চিকিৎসা, scouting network, broadcasting এবং transfer market অল্প কয়েকটি ধনী দেশে কেন্দ্রীভূত থাকতে পারে। মাঠে inclusion দৃশ্যমান হয়, কিন্তু সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার redistribution ঘটে না।
এটি বণ্টনহীন বৈচিত্র্য।
মরক্কো এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা উদাহরণ। দেশটি ইউরোপে বেড়ে ওঠা প্রবাসী খেলোয়াড়দের জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, কিন্তু শুধু diaspora talent-এর ওপর ভরসা করেনি। নিজস্ব academy, youth development, training centre এবং federation capacity-তেও বিনিয়োগ করেছে। ফলে প্রবাসী খেলোয়াড় ও স্থানীয়ভাবে তৈরি খেলোয়াড়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একই football ecosystem-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
গ্লোবাল সাউথের জন্য শিক্ষা এখানেই: diaspora কোনো দুর্বল স্থানীয় ব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, অর্থ ও নেটওয়ার্ক দিয়ে তাকে শক্তিশালী করার সেতু হতে পারে।
একজন খেলোয়াড়কে বড় করার গল্পও একক মালিকানার নয়। পরিবার হয়তো তাঁর জন্য প্রথম ত্যাগ স্বীকার করেছে; স্থানীয় পাড়া প্রথম মাঠ দিয়েছে; আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে; academy পেশাগত দক্ষতা তৈরি করেছে; আর খেলোয়াড় নিজে বছরের পর বছর শ্রম, অনিশ্চয়তা ও ব্যর্থতা সহ্য করেছেন। তাই তাঁর সাফল্যের ওপর কোনো এক রাষ্ট্রের একচ্ছত্র দাবি নৈতিকভাবে দুর্বল। প্রশ্ন বরং—এই যৌথ বিনিয়োগের সুফল কতটা ন্যায়সংগতভাবে ভাগ হয় এবং সেই সাফল্য নতুন প্রজন্মের জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করে কি না।
বাংলাদেশও এই গল্পের বাইরে নয়। ইংল্যান্ডে জন্ম এবং Leicester City-র football system-এ গড়ে ওঠা হামজা চৌধুরী বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নামার পর গ্যালারি ভরেছে, জাতীয় ফুটবলে নতুন আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এটি leg drain-এর বিপরীত দিক—এক দেশে তৈরি দক্ষতা diaspora-র মাধ্যমে পূর্বপুরুষের জাতীয় দলে ফিরে আসছে।
কিন্তু একজন হামজাকে পাওয়া আর বাংলাদেশে হাজারো শিশুর হামজা হয়ে ওঠার ব্যবস্থা তৈরি করা এক কথা নয়। প্রবাসী তারকা স্থানীয় academy, school league, coaching এবং youth development-এর বিকল্প হতে পারেন না।
আমরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জন্য কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা বানাই, রাত জেগে ম্যাচ দেখি। অথচ আমাদের শিশুদের ফুটবলার হওয়ার জন্য কতটি নিরাপদ মাঠ, নিয়মিত school competition, পুষ্টি, মানসম্পন্ন academy বা স্বচ্ছ selection pathway তৈরি করেছি?
একটি দেশের ফুটবল সংস্কৃতি তার পতাকার দৈর্ঘ্যে নয়, একটি শিশুকে মাঠে পৌঁছাতে কত দূর যেতে হয়—তা দিয়ে মাপা উচিত।
বিশ্বকাপের বহুরঙের দলগুলো একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ দেখায়, যেখানে জাতি এক জন্মভূমি, এক বংশ বা এক গায়ের রঙে সীমাবদ্ধ নয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের নিচে যদি অর্থ, অবকাঠামো ও সুযোগের পুরোনো বৈষম্য অক্ষত থাকে, তবে এটি বৈচিত্র্যের পূর্ণ বিজয় নয়; বৈষম্যের সফল নান্দনিকীকরণ।
প্রশ্ন তাই খেলোয়াড়ের গায়ের রং নয়।
প্রশ্ন হলো—তাকে কে আশ্রয় দিয়েছে, কে বড় করেছে, কে তার শ্রমের মূল্য পেয়েছে, আর কে শুধু দূর থেকে তার নামে পতাকা উড়িয়েছে।