প্রতিক্রীয়াশীল বাংলাদেশের সমাজে
প্রতিক্রীয়াশীল বাংলাদেশের সমাজে নিজের পছন্দের বিষয় শেয়ার করার মত বিপদ আর নেই। এই সমাজে ডায়ালগ তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এদিকে ফেইসবুক আসার পর সমাজের চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সামাজিক মাধ্যম। কারণ সমাজটাই আসলে অসুস্থ ও জম্বি ধরণের হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলি ও ইন্টেরিম-কালের বিবর্তনের পরের পর্যায়ে সমাজ এবং তাই ফেইসবুকও প্রকাশ্যে বা গোপনে তীব্র মব-প্রবণ। ব্যক্তি তো মব-এর সাথে পারবে না। তাকে পালোয়ান হতে হবে। এসবের পরেও অনেকে এবং আমিও এই পালোয়ানগিরি করি। যদিও কখনো কখনো, বলা যায় প্রায়শই শক্তির অপচয় ঘটাই।
সমাজে যা দরকার তা হল ডায়ালগ তৈরি হওয়া। সেটি যে প্রায়শই ঘটেনা না, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কারণ দুটি শান্ত মস্তিষ্ক আর মনন কথা বলে না। একাধিক শান্ত মনন সেটি বোঝার চেষ্টা করেন না। সাধারণত একাধিক মাস্তানদের মধ্যে লড়াই চলে। কোনটা পাবলিক স্পেস আর কোনটা প্রাইভেট স্পেসের বিষয়, এই বিবেচনা আর কাজ করে না।
দৈনন্দিন দোজখে বেহেস্তের পাখির ডাক আপনি শুনতে পারবেন না। কারণ শুধু এটি নয় যে পাখি ডাকছে না। বরং এটিও, যে আপনার কান নষ্ট হয়ে গেছে।
জম্বি-মানুষ এক লাইনে মহাবিশ্ব বুঝে ফেলার বাসনা করেন। তাই মব ও জম্বিকূলকে এক লাইনের বাণী দিয়ে সন্তুষ্ট রাখার নাম বুদ্ধিজীবিতা হয়েছে।
এখন তাই সময় হল প্রিয় বিষয়কে রক্ষা করার। একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন যে আমরা মূলত আমাদের আবর্জনা উগরে দিতেই ফেইসবুকে আসি। সেটাকেই পাঠককূল নামক জম্বিরা সানন্দে গ্রহণ করেন। কারণ বোধ এবং রুচি দুটোই নীচের দিকে। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেন, রুমি বলেন, নজরুল বলেন কিংবা মাইকেল জ্যাকসন, ম্যারি ওলস্টোনক্র্যাফ্ট, এগুলি নিয়ে সুকোমল আলোচনার জায়গা সংকুচিত। রুহানি আলাপ তো বাদই দিলাম।
সবাই ধস্তাধস্তিতে লিপ্ত।
আমি আমার একটি প্রিয় শব্দ নিয়ে বরং কথা বলি। দশা।
দশা-একটি সুন্দর শব্দ। “দশা” শব্দটি মানুষের জীবন, সমাজ ও অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক অবস্থাকে সূক্ষ্মভাবে ধারণ করে—কখনো তা ব্যক্তির মানসিক বা শারীরিক অবস্থা, কখনো বা বৃহত্তর সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। আরবি ও উর্দুতে এর নিকটতম প্রতিশব্দ হালحال ও হালত حالت, যা জীবনের চলমান ও পরিবর্তনশীল অবস্থাকে নির্দেশ করে; ইংরেজিতে “state,” “condition,” বা “phase” শব্দগুলো একই অর্থবোধকে বিভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ করে। তবে “দশা” শব্দটির বিশেষত্ব হলো এর অন্তর্নিহিত গতিশীলতা—এটি স্থির কোনো অবস্থাকে নয়, বরং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে বোঝায়। তাই “দশা” শুধু একটি অবস্থার নাম নয়, বরং সময়, অভিজ্ঞতা ও প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের অবস্থান ও অবস্থান্তরের একটি গভীর ভাষিক ও সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
অনুধাবনের জন্য স্থির হতে হয়। ধস্তাধস্তি আর মারামারিতে অনুধাবন বিষয়টি ঘটে না, থাকেও না।
অনুধাবনের দশা তৈরি রাখা ও জারি রাখা মনে হয় এখন আমাদের দীর্ঘ মেয়াদী সাধনা।