| | |

কলোনিয়াল বায়োস্কোপে সাবল্টার্ণ দেখে নবাব সিরাজউদ্দৌলা (রঙ্গীন)

নিক ভাইরে আমারে পরিযায়ী কাকের চাইতেও বেশি আমেরিকান লাগতো আগে। উদ্যোগী বিজনেস পারসনও মনে করছিলাম। ভাবতাম স্পিরিচুয়াল ট্যুরিজম (ফাইন্ড ইয়োরসেল্ফ, রিকানেক্ট টু ইয়োর রুট, নিউ এইজ স্পিরিচুয়ালিটি ইত্যাদি) নিয়ে উনি আরো আগাইবেন। কিন্তু উনি না বানিজ্যটা বাড়াইলেন না সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। সাংস্কৃতিক বানিজ্যকার হিসেবেও তিনি ছোটই রইলেন। কেন?

তিনি সংস্কৃতির ইকোট্যুরিজমটাও ঠিকমত করলেন না। বানায়া ফেললেন লালনফেস্ট। আমরাও দেখলাম। মনে হইল যেন নিক ভাইয়ের স্বপ্নই ছিল একটা ফেস্ট করার। কতদিন তিনি ফেস্ট করেন নাই। আর এইটা করতে যায়া তিনি বরং কম আমেরিকানই হইলেন। বরং ইন্ডিয়ান হইলেন বেশি। তাও আশির দশকের ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া। আসলে তারও অধম। ফলে বাজারটাও আর বাড়ার সম্ভাবনা থাকলো না। দাম বাড়লো, ভলিউম কমলো। নিশ মার্কেটে পরিণত হইল। মধ্যবিত্ত ঢুকার রাস্তা বড় কইরা তিনি আর সবার রাস্তা সংকুচিত করলেন। ফলে লালন হইয়া উঠলেন পালন ফেস্ট।

মধ্যবিত্তও আরো ছোট হইল। কারণ তার তো আর আগের ক্রয়ক্ষমতাতো নাই। সে নিম্নবিত্তগামী। উর্দ্ধমধবিত্তগামীর কাছে লালন এত জরুরি না। একটা কন্টেন্ট ক্রিয়েশনের জায়গা। একইভাবে লিটফেস্ট যেমন ছোট হয়। এলিটের কাছে চলে যায়। বইমেলা চাইপা যায়।

এটি কৌশলগত দিক থেকেও এন্টি লালন। লালনরে বানানো হইল ট্যান্জিবল হেরিটেজ। মানে তারে আটকানো গেল। এখন আগের চেয়ে চড়া দামে কিনতে হবে। দাম বাড়লো কেন? কারণ নিরাপত্তা। এবং নিরপত্তাহানী হইল বাকীদের। লালন পালনকারী বলিয়া কথিতরা নিজে নিরাপদ থাকতে যায়া বাকীদের অনিরাপত্তার দিকে ঠেইলা দিল। লালনের আখড়া তো একটা স্থান মাত্র। আসল শক্তি তো লালনের বোধ। এখন একটা আখড়াকে তথাকথিত নিরাপদ ও আর্ন্তজাতিকভাবে দর্শনীয় করার মধ্য দিয়ে তো লালনকে একটা জায়গায় আটকায়া ফেলার চেষ্টা হইল। ভবিষ্যতের নির্দেশনাও দেয়া হইল। কেবল এলিটিরাই ইউনেস্কোর ট্যান্জিবাল হেরিটেজের স্বাদ গ্রহণ করিবেন। বাকীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কারো নহে।

নিকভাই যে লালনের ধারক বাহকের রোলটা নতুন করে রিকনফিগার করে নিলেন তাতে উনি নিজেরেই আর ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক আর হইতে দিলেন না। ম্যানেজারই খালি থাকলেন। সেইটাতেই খুশি থাকলেন। তাই আমাদের বাকীদেরও আর হইতে দিলেন না। আমাদের ছোট ছোট সংরক্ষিত বনঞ্চালে ভ্রমণের আহবান জানাইলেন। সেইখানে একটা এলাকার ম্যানেজার হইয়াই খুশি থাকলেন। এই খুশি থাকাটা কলোনিয়াল। একটা পিওর পলাশী সিনড্রোম।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাংস্কৃতিক উদ্যোক্তাদের জন্য এইটা দুঃসংবাদ। কারণ সামনের ইন্ডাস্ট্রীতে তার জায়গা এমনিতেই নাই। লালন ইন্ডাস্ট্রী তৈরি না করতে দেয়ার এই কালচার আসলে ছোট কইরা ফেলল লালনরে। উনি আগেই বড় ছিলেন। বিগত বছরগুলাতে ধুঁকতে ছিলেন একটা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মত। এইবারের লালনফেস্টে বরং নির্ভরতা বাড়লো নতুন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলার মর্জির উপর। ফলে বিপুল জনসংখ্যা ও ঐতিহ্যের বাংলাদেশ ভর্তি যেসব সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসমূহ এখনো একইভাবে লালনখ্যাতি পাইলো না; সেগুলিও আরো হুমকির মুখে পড়ল। মাজারে মাজারে তো আপনি পরিযায়ী কাক নিয়ে যাইতে পারবেন না।তাতে নিক ভাইয়ের পদ্ধতি ও উদাহরণ বাকী সবগুলিরে আক্রমণের জন্য আরো উপযুক্ত করে তুলল।

সেইটার আভাস আমি পাইতেছিলাম, যখন তিনি নাচ নিয়ে প্রথম কথাটা বলছিলেন। কথাটা মোটা কেবল ছিল না। বহুকিছুকে ছোট করার প্রজেক্টও ছিল। এমবডিমেন্টকে তিনি বিশেষ সংজ্ঞায়নে নামায় দিতে শুরু করেছিলেন। নাচা ঠিক নয় বলার মধ্য দিয়ে। তো “নাচ” কি? কার কাছে কে নির্দেশ দিল এইটা “নাচ” সেইটা না। কতরকমের নাচ আছে দেশে? “নাচ” এ সমস্যা কার? কেন? মনে রাখতে হবে এইটা ধইরা ধইরা দাড়িচুল কাইটা দেওয়া প্রজেক্টেরই এক্সটেনশন।

গল্পতো আসলে নাচের ছিল না। কোনটাকে নাচ বলে সংজ্ঞায়িত করা হবে, কোনটাকে বৈধ করা হবে, কার সামনে নাচা ঠিক আর কোনটা বেঠিক এবং কোনটাকে খারিজ করা হবে সেইটা ছিল প্রশ্ন এবং টেস্ট। সেইটার প্রভাবক হওয়ার লোভে নিকভাই পুরো ডিসকোর্সের জটিলতাকে বিসর্জন দিয়া দিলেন। এই হইল আপনাদের দার্শনিক। এইটা হল লালনরে ঠাইসা আরো ছোট প্যাকেটে ঢোকানোর ইন্ড্রাষ্ট্রির গোড়াপত্তন। যেখানে তিনি অগ্রবর্তী ভূমিকা রাখলেন। তিনি ধইরা ধইরা চিন্তার দাড়িচুল কাটার রক্তাক্ত কর্মকান্ডটি ঘটাইলেন। তিনি পলাশীর মাঠে বেঈমানিটা করলেন। যদিও হাস্যকর হইল তাতেও তিনি মালিকের ভূমিকাটি নিলেন না। নিলেন ম্যানেজারের। নাকি তারে দেওয়া হইল না?

একটা বন তার শক্তি হারায় সংরক্ষিত হবার মধ্য দিয়ে। এইটা থেকে বোঝা যায় যে কৌশলগত দার্শনিকতাতেও লালনের চেয়ে লালন-পালনকারীরা অনেক নিম্ন যোগ্যতার। এমনকি তাদের উচ্চাভীলাসও ছোট। তাই কৌশলও পিচ্চি পিচ্চি। এই ছোটত্বের সাথে সংযোগ রয়েছে স্বপ্নের নির্মাণের। মানুষের বাস্তবতার উচ্চতাকে ছোট ছোট স্বপ্নে আটকাইয়া দেওয়ার। পরে বাস্তবতাকে আরো ছোট করে তোলা। আর তাই একটা প্রশ্ন আমরা মধ্যে ঘুরপাক খায়।

লক্ষকোটি লালন গবেষকে লালন বেশি শক্তিশালী না একাই বেশি? উত্তর মিলেনা। যাই হোক এইবারেরটা পুরোটাই কলোনিয়াল। আয়রনি হইল, এইটার ছদ্মবেশ ছিল “সাবল্টার্নের”। যদিও সেটাই কি হবার কথা ছিল না?

একটা এতবড় বিচিত্র জনগোষ্ঠীকে ছোট রাখার যেই কলোনিয়াল ট্রেনিং সেইটা আমরা দুইভাবে এক্সিকিউটেড হইতে দেখলাম,

১. লালনফেস্ট এর মধ্য দিয়ে।

২.”সভ্য” করার প্রজেক্টের মাধ্যমে।

“সভ্য” করার প্রোজেক্ট যে দার্শনিকভাবে কলোনিয়াল প্রোজেক্ট সেটা নিয়ে তো কারো সন্দেহ থাকার কথা না। তার মানে কি? জুলাই সনদের পর আমরা “সভ্য” হওয়া শুরু করলাম? সাইন কইরাই? সাইনের আগে এতগুলা মানুষের আত্মত্যাগ তাইলে কি ছিল? “অসভ্যতা”? অলিখিত ভাষিক অসভ্যতা? তাহলে এই যে ধরে ধরে মব বানানো হইল সেইটা কি ছিল? “অসভ্যকরণ” প্রোজেক্ট? জনগণরে আরো ছোট করে একবার অসভ্য করা আরেকবার সভ্য করা? একবার লালন করা আরেকবার পালন করা? কারা এইটার মালিকানা নিছেন? তারা সভ্য-অসভ্য লালন পালন করে মানুষরে কি বড় করলেন না ছোট?

যাই হোক সভ্যায়নের ম্যানেজারও ছোটই রইলেন। বহুদিন এই মাটিতে বড় মানুষ হয় না।

এই যে নতুন সভ্যকরণের হাওয়া; সেটির পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে যা ঘাপটি মেরে বসে আছে তা হইল বিশুদ্ধ হইবার হাওয়া। কে সংজ্ঞায়িত করে দেবে কোনটা বিশুদ্ধ? কে বলবে এই ভার্শনের বিশুদ্ধতা আসল বিশুদ্ধতা না? আগের দল চেতনা বিশুদ্ধিতে নামছিলেন। মনে পড়ে? সামনের দলগুলা কোন বিশুদ্ধিতে নামবেন? ধইরা ধইরা দাড়িচুল কাইটা দেওয়া নাকি লালন পালন? আমার মনে হয় এই দুইটার একটা মিক্সচার। আগে ছিল উন্নয়ন এইবার আসল সভ্যায়ন। তাই কবি বলেছেন অর্থনীতি মূলত কলোনিয়ালই। আর এই কলোনিয়াল ম্যানেজারির দায়িত্ব নিজেদের কান্ধে তুইলা নিতেই না কত মারামারি। কত ছোট্ট এই মারামারি।

যেইটাতে নামুক এতবড় বিচিত্র জনগোষ্ঠীকে আরো ছোট রাখাই যে মূল উদ্দেশ্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। এইবার বোঝা গেল কে সাবল্টার্ন আর কারা ম্যানেজার? পিওর পলাশী সিনড্রোম। এই অঞ্চলে একই সিনেমা নতুন চরিত্র নিয়া হাজির হয়। আমাদের একটাই সিনেমাঃ রঙ্গিন নবাব সিরাজদ্দৌলা।

আমরা তাই বারবার বুকে হাত দিয়া বিস্ময়ে হৃতবাক হইয়াই থাকিবো আর বলিবোঃ “বাংলার ভাগ্যাকাশে আজ দুর্যোগের ঘনঘটা” …পুরাই দার্শনিক ভাবুক আর পরিযায়ী কাক হয়া গেলাম।

১৮ই অক্টোবর ২০২৫

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *