কবুতর
এই লেখাটি দৈনন্দিন শহুরে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষতি, সহনশীলতা এবং সম্পর্কের নীরব রূপকে ধরার চেষ্টা।
বর্ষাকালে বনানীতে বাইক থেমে গিয়েছিল একবার, ওয়ারিং এর সমস্যা। ওসমান সেবার উদ্ধার করেছিল। ওস্তাদ মেকানিক। ছোট একটা সুইচ বদলে দিয়েই গাড়ী স্টার্ট করে দিয়েছিল। এরপর বনানী থেকে চেয়ারম্যান-বাড়ীর ছোট গলিটা দিয়ে যতবারই অতিক্রম করেছি একবার করে খোঁজ নিয়েছি। কখনো বাইকের সমস্যা নিয়ে, কখনো শ্রেফ খোঁজ নেবার জন্য। যদিও বিগত তিন-চার-মাস কোন খোঁজই পাইনি।
এবারে দেখা হতেই সহাস্যে বলল,
“বলেন ভাই কি সেবা করতে পারি”।
আমি বললাম,
“আর বইলেন না, অন্ধের মত বাইক চালাইতেছি, মিররটা টাইট কইরা দেন; আর কইছিলেন এতদিন?”
ক্যাম্পাস সরে গেছে মহাখালী থেকে মেরুল বাড্ডায়। গুগল ম্যাপে দূরত্ব খুব বেশি না দেখালেও বাস্তবতায় দূরত্ব বেড়ে গেছে অনেক। কারণ এই শহরে দূরত্ব নির্ভর করে জ্যামের উপর, নগরের রক্ত প্রবাহে কখন কোথায় ক্লট জমবে সেটার উপর নির্ভর করবে আপনি আসলে কতদূর যেতে পারবেন এবং কতখানি ক্লান্ত হবেন। মেরুল বাড্ডা অত্যন্ত ক্লটপ্রবণ জায়গা। নতুন ক্যাম্পাসকে ঘিরে জনবলের স্থানান্তরও হয়েছে অনেক। এক জায়গায় ভীড় কমে গেছে তো অন্য জায়গায় ভীড়, বেচাবিক্রী এবং দাম সবকিছুই বেড়ে গেছে। তাই পুরোনো পথে ক্যাম্পাসে যাওয়াটা অনেকটা নস্টালজিয়ার মতই। এই পথে প্রয়োজন ছাড়া আর খুব যাওয়া হবেনা সেটি সহজেই অনুমান যোগ্য।
আজ সকালে ফ্লাইওভারে ওঠার পর কুয়াশা এমনভাবে চেপে ধরেছিল যে সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। এরমাঝে ডানদিকের রিয়ারভিউ মিরর ঘাড়ভাঙ্গা হয়ে নড়ছিল, পেছনের কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। ফলে সামনে পেছনে দুদিকেই বিপদের আশংকা বাড়ছিল। ঢাকা শহরের মহান চালকেরা রিয়ারভিউ মিররের উপর হামলা চালান বেশ, পথিকেরাও। হুশ করে বাড়ি দিয়ে মিরর বাকিয়ে চলে যান, কোনপক্ষই ক্ষমা চাননা। ফলে গুলশান যেতে যেতে রিয়ারভিউ মিররের নাট টাইট করাটা আবশ্যক হয়ে উঠেছিল। বাইকাররা ঢাকা শহরে নরোম কবুতরের মত, মাঝে মাঝে বিপ্লবী হতে চাইলেও পরিশেষে অত্যন্ত দূর্বল অস্তিত্ব, ফুরুৎ-ফারুৎ উড়াল দিলেও এর ওর খোঁচায় যখন তখন নাই হয়ে যেতে পারে।
ওসমান জানালেন যে বিগত তিনচারটা মাস তার হাসপাতালেই কেটেছে। স্ত্রী সন্তান-সম্ভবা ছিলেন। প্রথম সন্তান।
“আমার তরফ থেকে চেষ্টার কোন কমতি করি নাই, ডাক্তারকে বলেছিলাম যত টাকা লাগে লাগুক, তারপরও পারে নাই”।
বাচ্চাটা কিডনীতে সমস্যা নিয়ে জন্মেছিল। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মারা যায়। ওসমানের সন্তানের এই খবরে আমি ভীষণ একটা ধাক্কা খেলেও, ওসমানের চোখে মুখে গভীর বিষণ্নতার তেমন কোন ছাপ ছিল না কিংবা থাকলেও আমি ধরতে পারি নাই।
তিনি বললেন, “আল্লায় হায়াত রাখেন নাই, তাই নিয়া গ্যাছে”।
ঘটনাক্রমে ওসমানের বাবাও দোকানে উপস্থিত ছিলেন, পুত্র যখন তার নাতির মৃত্যুর বর্ননা করছিলেন; তাঁকে বরং বেশি বিষণ্ন মনে হচ্ছিল। সেই বিষণ্নতা অবশ্য আরো মনোগ্রাহী বিষয়বস্তুর কারণে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল।
“ঐ, দশ নম্বরটা নিয়া আয়” বলে ওসমান যখন সহকারী মেকানিককে হাঁক দিল তখন থেকেই আলাপের বিষয়বস্তু সরে যাওয়া শুরু হল।
হঠাৎই স্থানীয় ইয়াং ছেলেরা কীভাবে নেশায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সেই নিয়ে আলাপ শুরু হল। দেখা গেল এই বিষয়ে ওসমান আর তার বাবার বিপুল উৎসাহ।
ঠিক এই সময়টাতেই খাঁচায় করে কবুতর নিয়ে যাচ্ছিলেন ওসমানের একজন পরিচিত। আমাদের দেখে থামলেন। আমাদের কথাবার্তার প্রথম অংশের কিছুই তিনি শুনেননি তবে নেশা-র অংশটুকু যে শুনেছেন তা আলবৎ মনে হল। তিনিও আগ্রহ নিয়ে আলাপে যুক্ত হলেন।
“ভাই কবুতরের নেশা হইল আসল নেশা। আপনে কোন নেশাখোররে কবুতরের নেশা ধরায়া দেন, দেখবেন যে সে কবুতর নিয়াই আছে। একমাসে মাথায় সব নেশা ছুইট্টা যাবে। কখন কবুতরকে খাওয়াবে, কখন পানি দেবে। আর কোন নেশার দরকারই নাই।” ওসমানের সেই পরিচিত বন্ধুটি বললেন। এবারে ওসমানও সেই বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান নিয়ে হাজির হলেন। “তবে আগের মত আর কবুতর পালা সম্ভব না ভাই, চল্লিশ টাকার খাবার হইছে আশি টাকা। আগে যেই কবুতর বেচা গেছে দশ হাজার-বিশ হাজার টাকায়, সেইটার দাম এখন পাঁচশো টাকাও ওঠেনা। আর সবার হাতে কিন্তু কবুতর হয় না ভাই। কবুতর হয় ফকির কইরা দিবে নাইলে রাজা বানায়ে দিবে। আমার এক বন্ধু এক কবুতর আটবার ব্যাচছে। যেইখানে বিক্রী করে কিছুদিন পর সেইখান থেইক্কা চইলা আসে। নতুন মালিক টেপ দিয়া পা আটকাইয়া রাখে, তাও চইলা আসে। কবুতর কিন্তু ভাই একা হাতের জিনিস। সবার হাতে হয় না।”
ক্যাম্পাস দূরে চলে যাওয়ায় অনেকের দূরত্ব বেড়ে গেছে বেশ, কমেছেও কারো কারো। শিক্ষার্থীরা দলে দলে বাসা পরিবর্তন করছেন, এলাকা পরিবর্তন করছেন। মেরুল বা্ড্ডার এলাকা জুড়ে টু-লেট। নতুন আস্তানার খোঁজে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন অনেকে। নতুন ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে কলকাকলিতে মাতিয়েও তুলছেন। দূরত্ব কমানোর জন্য বাসা থেকে চাপও বাড়ছে। এলাকা কি ছাড়তে হবে?
মিরর ঠিক হয়ে গিয়েছিল। খানিকটা অন্যমনষ্ক হয়ে তাই ওসমানকে জিগ্গেস করলাম,
“তো যেই কবুতর আটবার ফিরে এসেছিল তার কি হইছিল?”
ওসমান বলল,
“আর কি! আমার বন্ধু রান্না করে খেয়ে ফেলছে, বলছে, এক কবুতর আর কতবার বিক্রী করা যায়?”
শরৎ চৌধুরী, ২০২৪, ঢাকা।