কালো ব্যাগের শহর
কালো ব্যাগের শহর | সমসাময়িক বাংলা ছোট গল্প
দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। রুহুল আমিন কালো ব্যাগ হাতে বের হলেন—বাঁ হাতে। ব্যাগের নিচের অংশ ভেজা। একটু আগেই অফিসের সামনে ভয়ানক শব্দে দুটি ককটেল ফেটেছে। জীবনযাত্রা স্বাভাবিক—মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
সকালে ব্রাশ করা হয়নি। সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। মুখে দুর্গন্ধ। মেজাজ খারাপ। লাঞ্চ টাইমে ডাক্তারকে ফোন দিলে বিরক্ত কণ্ঠে জানানো হয়েছিল—ছেলের প্লাটিলেট পঞ্চাশ হাজারের নিচে, আর দ্রুত কমছে। বি পজিটিভ রক্ত কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। এত কমন একটা ব্লাড গ্রুপ—তাও নেই।
সোহরাওয়ার্দী পৌঁছাতে পনেরো মিনিট ভেবেছিলেন; লাগল আধ ঘণ্টারও বেশি। পথে তিনটা পুড়ে যাওয়া বাস। দুইটা পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে ছুটে গেল। রুহুল চমকে উঠলেন—কলেজ গেটের দিকে আগুনের আলো।
ছেলে পাঁচতলার ওয়ার্ডে। অবস্থা খারাপ হলে সিসিইউ। লিফট নেই—সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বাঁ হাত টনটন করছে। দুই নার্স মোবাইলে চোখ গুঁজে কথা বলছিল—
—“লকডাউন সফল?”
—“কিসের সফল? দুই পক্ষই মানুষ মারতেছে।”
ওয়ার্ড ভর্তি মানুষ। অধিকাংশই শিশু। বাবা–মা বেড ঘিরে রেখেছে। কোনো ডাক্তার নেই। মোমেনা বেডের পাশে ছেলের হাত ধরে জুবুথুবু। একমাত্র সন্তান নিথর পড়ে আছে। রুহুল তাকাতে পারলেন না।
ব্যাগটা মোমেনার হাতে দিয়ে বললেন, “এইটা সরায়ে রাখো।”
মোমেনা অপেক্ষাতেই ছিলেন—ব্যাগ হাতে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। এর মধ্যে রুহুল দুইটা ফোন করলেন। রক্তের ব্যবস্থা হচ্ছে। প্রয়োজনে প্রাইভেট হাসপাতালেও নেয়া হবে।
রুহুলের হাতে সময় কম। সব ঠিক করা আছে। তাকে এখান থেকে চলে যেতে হবে। এমন সময় নার্সদের চিৎকার—
—“আরে, ভয়ানক ঘটনা! ব্রাশফায়ার কমিশনার তো নাই! অনুমান করা হচ্ছে ফোর্সের নিজের লোকই এমন ঘটনা ঘটিয়েছে।”
ওয়ার্ডের সবাই ফোনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পাশ থেকে একজন অভিভাবক বলল,
—“ঠিকই আছে, বলদ দিয়া হেলিকপ্টার চালাইলে তো এমনই হবে।”
রুহুল ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। বুঝলেন—আজ পুরো শহরই তাকে আর ছাড়বে না।
শরৎ চৌধুরী, ১৪ই নভেম্বর ২০২৫